সকাল গড়িয়ে দুপুর আসতেই অন্য রকম এক উৎসবের আলোয় রঙিন হয়ে ওঠে যোগীরছিট উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। শিক্ষক, কর্মচারী, বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকেরা ভিড় করতে থাকেন স্কুল মাঠে।
এ আয়োজন টানা ৩৭ বছর তিন মাস ১৬ দিন ধরে একই বিদ্যালয়ে পাঠদান শেষে অবসরে যাওয়া বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে ঘিরে। তাঁকে বিদায় জানাতে শিক্ষক, কর্মচারী এবং বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা শিক্ষাঙ্গণ সাজিয়ে তোলেন।
অনুষ্ঠান শেষে বিকেল ৫টার দিকে রাজকীয় আয়োজনে ঘোড়ার গাড়িতে করে স্কুল থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে বিধাই গ্রামের নিজ বাড়ীতে তাঁকে পৌঁছে দেওয়া হয়।
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদ ইউনিয়নের যোগীরছিট উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সাখাওয়াত হোসেন বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) কর্মদিবস শেষে অবসরে গেছেন। সহকারী শিক্ষক হয়ে ওই উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগ করেছিলেন।

৩৭ বছর তিন মাস ১৬ দিন চাকরি শেষে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে অবসরে গেছেন তিনি। তাঁর এই অবসরকে রঙিন ও প্রাণবন্ত করে তুলতে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মচারী, শিক্ষার্থীরা এই রাজকীয় বিদায়ের আয়োজন করেন। বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে একটি সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়ি প্রস্তুত। বিদ্যালয় ভবন থেকে ঘোড়ার গাড়ি পর্যন্ত দাঁড়িয়ে আছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বের হয়ে এলেন। তাঁকে করতালি দিয়ে স্বাগত জানায় সবাই। প্রধান শিক্ষক উঠে বসলেন ঘোড়ার গাড়িতে। ঘোড়ার গাড়ির আগে পিছে শতাধিক মোটরসাইকেল এবং একটি পিকআপে ব্যান্ড পার্টির সাথে শিক্ষার্থীরা নেচে গেয়ে তাদের প্রিয় শিক্ষককে বিদায় জানান।
যোগীরছিট উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক (শনিবার ১৮ এপ্রিল থেকে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) সাহাব উদ্দিন বলেন, সাখাওয়াত হোসেন ১৯৮৮ সালে যোগীরছিট উচ্চ উচ্চবিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক (ইংরেজী) হিসেবে যোগদান করেন। ২০২৩ সালের ১৯ জুলাই থেকে বিদায়ের আগ মুহুর্ত পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বৃহস্পতিবার অবসরে যান তিনি।
স্কুল প্রতিষ্ঠাকাল থেকে তিনি দীর্ঘ ৩৭ বছর তিন মাস ১৬ দিন শিক্ষকতা জীবনে পার করেছেন একই স্কুলে। শিক্ষকতা জীবনের শেষ দিনে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের এমন আয়োজন দেখে তিনি আনন্দে কেঁদে ফেলেন। এই আয়োজনে যেমন বিদ্যালয়ের বর্তমান ছাত্রছাত্রীরা অংশ নেয়। অনেক প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা এবং অভিভাবকও জড়ো হন শিক্ষাঙ্গনে। শিক্ষকের আগমনের মুহূর্তে ব্যান্ড বাজিয়ে ও ফুল দিয়ে বরণ করা হয়।
তাঁর অবসর উপলক্ষে বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত সভায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, চাকরি জীবনে আমি কোনোদিন ছুটি নিইনি। স্কুল শুরু হওয়ার আধা ঘন্টা আগে এবং ছুটি শেষে অফিসের কাজ শেষ করে এক ঘন্টা পর স্কুল থেকে বের হয়েছি।
আমি সব সময় স্কুলের উন্নতি ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে চিন্তা করতাম। কোনো ক্লাসের শিক্ষক না এলে আমি নিজেই ক্লাস নিয়েছি। চাকরিজীবনে আমি কোনো দিন অনিয়ম করিনি। শিক্ষার্থীদের সব সময় নিজের সন্তানের মতো শিক্ষা দিয়েছি। সব সময় চেয়েছি, শিক্ষার্থীরা ভালোভাবে পড়াশোনা করে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হবে।
তিনি আরো বলেন, আজকে তারা (শিক্ষক, কর্মচারী এবং বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা) যে আয়োজন করেছে, এটা অভূতপূর্ব। যে আবেগময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে, শিক্ষকতা না করলে বা অন্য কোনো পেশায় থাকলে মনে হয় না আমি এই সম্মান, এই ভালোবাসা পেতাম না।
আমার কাছে আজকে সবচেয়ে বড় আনন্দের হচ্ছে, যে প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে যোগদান করেছিলাম, সেই একই প্রতিষ্ঠান থেকে আজ অবসরে গিয়েছি। সকলের কাছে আমি দোয়া চাই, যাতে শেষ জীবনটা ভালোভাবে কাটাতে পারি। সকলে আমার জন্য দোয়া করবেন বাকি জীবন যেন মহান আল্লাহ আমাকে সুস্থ রাখেন।
শিক্ষক, কর্মচারী, বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক সাখাওয়াত হোসেন স্যারের কর্মজীবনে ছাত্রদের প্রতি তাঁর দরদ, স্নেহ-ভালোবাসা ও পাঠদানের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেন । প্রাক্তন ছাত্র কাওরাইদ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য (মেম্বার) মমিনুল কাদের বলেন, স্যার খুব ভালো ছিলেন।
শিক্ষার্থীদেরকে স্যার তাঁর সন্তানের মতো দেখতো। দীর্ঘ তিন যুগেরও বেশি চাকরির সময় শিক্ষার্থীদের পাঠদানের পাশাপাশি তিনি বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়েরও হিসাব রেখেছেন। বিদ্যালয়ের একটি টাকাও তাঁর হাতে কখনো নষ্ট হয়নি। কখনো তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ওঠেনি। অত্যন্ত সহজ-সরল মানুষটিকে হারিয়ে তাঁরা মর্মাহত।
শিক্ষক জালাল উদ্দিন বলেন, সাখাওয়াত স্যার ছিলেন একজন সাদা মনের মানুষ। তাঁরা একজন সৎ ও কর্মিষ্ঠ সহকর্মী হারালেন। এমন শিক্ষক আর হয়তো আমরা পাব না। স্যারের নীতি-আদর্শকে সামনে রেখে আমরা আমাদের কার্যক্রম চালাব।
শ্রীপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, সাখাওয়াত স্যারের মধ্যে প্রধান শিক্ষকের সকল যোগ্যতা ছিল। তিনি একজন ভালো শিক্ষকের পাশাপাশি ভালো একজন প্রশাসক। তাঁর নেতৃত্বে স্কুলের অন্য শিক্ষকেরা ছিলো ঐক্যবদ্ধ। এরকম শিক্ষকের বিদায় ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য শূন্যতা পূরন করবার নয়। আমি বিদায়ী শিক্ষকের আগামী দিন ভালো কাটবে প্রত্যাশ করছি।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

