AB Bank
  • ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ০৯ জুন, ২০২৬,

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad QR Code
BBS Cables
Janata Bank
  1. জাতীয়
  2. রাজনীতি
  3. সারাবাংলা
  4. আন্তর্জাতিক
  5. অর্থ-বাণিজ্য
  6. খেলাধুলা
  7. বিনোদন
  8. শিক্ষা
  9. তথ্য-প্রযুক্তি
  10. অপরাধ
  11. প্রবাস
  12. রাজধানী

আলুর বিষক্রিয়ায় বোরো ধানে বিপর্যয়, জমি ক্ষতিগ্রস্ত


Ekushey Sangbad
আব্দুল্লাহ সউদ, কালাই, জয়পুরহাট
০৩:২৮ পিএম, ১২ এপ্রিল, ২০২৬

আলুর বিষক্রিয়ায় বোরো ধানে বিপর্যয়, জমি ক্ষতিগ্রস্ত

জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় আলু চাষে ভয়াবহ ক্ষতির পর সেই পচা আলুর জমিতেই বোরো ধান রোপণ করে নতুন করে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন কৃষকরা।টানা বৃষ্টিতে জমিতে পচে থাকা আলুর বিষক্রিয়া,গ্যাস ও মাটির অস্বাভাবিক অবস্থার কারণে বোরো ধানের চারা রোপণের পরপরই পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

ফলে এক মৌসুমে দুই দফা ক্ষতির ধাক্কায় উপজেলার তিন শতাধিক  কৃষক এখন চরম আর্থিক সংকট, ঋণের বোঝা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন।

মাত্রাই গ্রামের কৃষক আনোয়ার হোসেন বর্গা নেওয়া ছয় বিঘা জমিতে গত বছরের নভেম্বর- ডিসেম্বরে কয়েক জাতের আলু রোপণ করেছিলেন।এতে তার খরচ হয় প্রায় দুই লাখ টাকা।পরিকল্পনা ছিল মার্চে আলু তুলে সেই জমিতে বোরো আবাদ করবেন।

কিন্তু মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে টানা চার দিনের বৃষ্টিতে তার সব জমি পানিতে তলিয়ে যায়।জমির আলু পচে একেবারে নষ্ট হয়ে যায়, একটি আলুও তুলতে পারেননি তিনি।পরে অর্থাভাবে জমি থেকে পচা আলু সরাতে না পেরে সেই জমিতেই ধানের চারা রোপণ করেন।কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যেই চারাগুলো পচে পড়ে যায়।প্রথমবারের ব্যর্থতার  পর আবারও চারা রোপণ করেনকিন্তু দ্বিতীয়বারও একই পরিণতি হয়।

আনোয়ার হোসেন বলেন,সব আলু পচে গেল, একটাও তুলতে পারলাম না। আলু সরাতে গেলে আবার শ্রমিক লাগবে,সেই টাকা ছিল না। তাই আলু রেখেই ধান লাগাইছিলাম।এক সপ্তাহের মধ্যে চারা মরে গেল।আবার লাগালাম,সেগুলোও গেল। পাশের জমিতে ধান ভালো আছে আর আমার জমিতে কিছুই টিকলো না। এখন চারা কোথায় পাব আর কখন লাগাবো কিছুই বুঝতেছি না। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, বর্গা নেওয়া জমিতে ফসল তুলতে না পারলে তার পরিবার নিয়ে বড় সংকটে পড়তে হবে।

একই চিত্র দেখা গেছে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়।মাত্রাই,মোসলেমগঞ্জ,উদয়পুর,আওড়া, ধাপপাড়া, চাকলমওয়া ও হাতিয়রসহ বিস্তীর্ণ মাঠ ঘুরে দেখা গেছে,যেসব জমিতে পচা আলু সরানো হয়নি,সেসব জমিতে বোরো চারা রোপণের পরপরই পচে যাচ্ছে।কোথাও আংশিক,আবার কোথাও পুরো জমির চারাই নষ্ট হয়ে গেছে।

অনেক কৃষক দুই থেকে তিন দফায় চারা রোপণ করেও কোনো ফল পাচ্ছেন না।জমির মাটি থেকে গ্যাসের বুদবুদ উঠতে দেখা যাচ্ছে, যা চারার গোড়ায় পচন সৃষ্টি করে দ্রুত গাছ মেরে ফেলছে।

কৃষকরা বলছেন, আলু পচে জমিতে এক ধরনের বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে।সেই পচন থেকে উৎপন্ন গ্যাস ও রোগবালাই চারার গোড়ায় আক্রমণ করছে।বিশেষ করে হাইব্রিড জাতের ধান বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।কিছু ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার রোপণ করা চারা শুরুতে হলুদ হয়ে গেলেও পরে কিছুটা সবুজ হয়,কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা টিকে থাকে না।

আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নের হাতিয়র গ্রামের কৃষক মোকারম হোসেন বলেন, ৯০ শতক জমির আলু একেবারে শেষ। দেড় লাখ টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে।পরে আবার ৩০ হাজার টাকা খরচ করে ধান লাগালাম,কিন্তু সব চারা পচে গেছে। এখন আবার লাগাতে চাই,কিন্তু চারা পাই না। জীবনে এমন বিপদে পড়িনি।তিনি অভিযোগ করে বলেন, কৃষি অফিস থেকে কেউ এসে আমাদের ঠিকমতো কিছু বলে নাই। আগে জানলে এইভাবে ক্ষতি হতো না।

আঁওড়া গ্রামের কৃষক ছফির উদ্দিন জানান,পচা আলু না সরিয়েই তিনি দুই দফায় ধানের চারা রোপণ করেছিলেন।কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো চারা টিকেনি।তিনি বলেন,ঋণ করে আলু লাগাইছিলাম, সব শেষ।আবার ঋণ করে ধান লাগালাম, সেটাও গেল।এখন ঋণের টাকা কীভাবে শোধ করবো জানি না।এই চিন্তায় রাতে ঘুম হয় না। মনে হয়, এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হবে।

স্থানীয় আরও অনেক কৃষক জানান, প্রথম দফায় প্রায় সবার চারাই পচে গেছে। পরে কেউ কেউ জমি চাষ দিয়ে আবার চারা রোপণ করেছেন। দ্বিতীয় বা তৃতীয় দফায় কিছু জমিতে আংশিক সফলতা এলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চারা টিকছে না।এখন চারা সংকট দেখা দেওয়ায় অনেক কৃষক বোরো আবাদ ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা করছেন। কেউ কেউ নতুন করে বীজতলা তৈরি করছেন, তবে সময় ফুরিয়ে যাওয়ায় ফলন নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

কৃষকদের অভিযোগ, সংকটময় সময়ে কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ে কোনো দৃশ্যমান তৎপরতা ছিল না এবং কোনো কর্মকর্তা সরাসরি গিয়ে পরামর্শ দেননি। ফলে অনেকেই না বুঝে পচা আলুর জমিতে বারবার ধান রোপণ করে আরও ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

কিছু হাইব্রিড ধান তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চারা টিকছে না কোথাও হলুদ হয়ে আবার সবুজ হলেও শেষ পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কৃষকদের মতে,কাগজে-কলমে পরামর্শ থাকলেও বাস্তবে  তার প্রয়োগ না থাকায় আলুর ক্ষতির পর ধানের নতুন ক্ষতিতে তারা ঋণের চাপ, চারা সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে চরম দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জয়পুরহাটে ৩৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছিল, যার মধ্যে কালাই উপজেলায় ১০ হাজার ৬৯০ হেক্টর। তবে অসময়ের টানা বৃষ্টিতে এই উপজেলার প্রায় ২ হাজার ৬৭২ হেক্টর জমির আলু পানিতে তলিয়ে পচে যায়, এতে প্রায় পাঁচ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন।সেই পচা আলুর জমিতেই এখন নতুন করে বোরো ধানের ক্ষতি দেখা দিয়েছে।

এ বিষয়ে কালাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হারুনুর রশীদ বলেন, বৃষ্টির পানিতে আলু নষ্ট হওয়ার পর কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল যেন তারা জমি পরিষ্কার করে নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করে ধান রোপণ করেন।

যেকোনো জৈব পদার্থ পচতে ১৮ থেকে ২০ দিন সময় লাগে কিন্তু অনেক কৃষক সে সময় না মেনে তাড়াহুড়ো করে চারা রোপণ করায় এই ক্ষতি হয়েছে। তিনি আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং যারা বোরো ধানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আউশ আবাদ করবেন, তাদের বীজ ও সার সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

 

একুশে সংবাদ/ওজি

সর্বোচ্চ পঠিত - সারাবাংলা

Link copied!