# বছরে ৬ হাজার ৮২১ মেট্টিক টন আনারস উৎপাদিত হয়
# বর্তমানে উপজেলায় ৪২৫ হেক্টর জমিতে আনারসের চাষ হচ্ছে
# মিষ্টি রসালো আনারস চাষে লাভবান চাষি আতর আলী
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে মিষ্টি-রসালো ‘হানিকুইন আনারস চাষে বাজিমাত করছেন সদর ইউনিয়নের ডলুছড়া গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা মো. আতর আলী। চাষি জানান, ডলুছড়া পাহাড়ি এলাকায় এবার ৩৫ একর জমিতে তিনি ‘হানিকুইন’ ও লেবু চাষ করেছেন।
এর মধ্যে ৭০ হাজার আনারসের চারা রোপণ করে গতকাল পর্যন্ত ১৫ হাজার আনারস বিক্রি করে ৪ লাখ টাকা আয় করছেন। আরো ৬ লাখ টাকার আনারস বিক্রির আশা করছেন তিনি।
কৃষক আতর আলী বলেন, চাষে সর্বমোট মাত্র ১ লাখ ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। চলতি বছরে বাম্পার ফলন এবং বাজার ভালো থাকায় তিনি গুণেরও বেশি লাভের আশা করছেন।
বর্তমানে বড় আকারের আনারসের পাইকারি মূল্য প্রায় ৬০ টাকা, মাঝারি ৪০ টাকা এবং ছোট আকারের ২০ টাকা। স্থানীয় কৃষি অফিসের পর্যাপ্ত সহযোগিতা পাচ্ছেন তিনি। ভবিষ্যতে আরও সহায়তা পেলে বড় পরিসরে আনারস চাষের পরিকল্পনা রয়েছে তার।
চাষি আতর আলী আরো বলেন, আনারস বিক্রি করে তিনি শুধু নিজেই আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হননি, বরং আশপাশের কৃষকরাও এখন তার কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
কৃষি সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলের কৃষি উন্নয়নে প্রকল্পের আওতায় ঢাকার খামারবাড়ির কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে আতর আলীকে শ্রেষ্ঠ কৃষক হিসেবে পুরস্কৃত করা হয়।
আনারস, লেবু ও শসা উৎপাদনের অন্য তিনি এ পুরস্কার লাভ করেন। তার উচুঁ-নিচুঁ পাহাড়ি টিলায় আনারস ছাড়াও মাল্টা, কফি এরাবিকা, রোবাস্টা, কাজু বাদাম, লটকন, ক্যানসার প্রতিরোধ উদ্ভিদ, আম, কাঁঠাল, লিচু, বেল, পেয়ারা, জাম্বুরা, কাচা মরিচ, নাগা মরিচ, সুপারি, কলা, সাজনা, করলা, শসা, করলা, লেবু, ক্যাপসিকাম, লটকনসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফল-ফলাদি চাষ করে এলাকায় সাড়া ফেলেছেন।
সরজমিনে দেখা গেছে উপজেলার বিষামণি, মাইজদিহি, ডলুছড়া, হোসেনাবাদ, এমআর খান, নন্দরানী, বালিশিরা, নূরজাহান, ডলুছড়া, সাতগাঁও ও মোহাজেরাবাদসহ প্রায় প্রতিটি ইউনিয়ন ও পাহাড়ি টিলা এলাকায় সারি সারি আনারস বাগান যেন এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।
কাঁটাময় ছোট গাছের মাঝখান থেকে সবুজ ফল ধীরে ধীরে যখন হলুদে রূপ নেয়, তখনই বাজারে তোলা হয় রসালো, সুগন্ধি এই আনারস।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা দীর্ঘদিন ধরেই আনারসের জন্য পরিচিত। উঁচু-নিচু টিলাভূমি, অনুকূল আবহাওয়া ও উর্বর মাটি আনারস উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় এখানকার ফলের স্বাদ ও গুণগত মান অন্য অঞ্চলের তুলনায় উন্নত। আনারস একটি পুষ্টিকর ও সুস্বাদু ফল হওয়ার পাশাপাশি দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল।
শ্রীমঙ্গলের আনারস স্বাদ ও মানের কারণে দেশব্যাপী বিশেষ সুনাম অর্জন করেছে। শ্রীমঙ্গলে চাষ হওয়া উল্লেখযোগ্য জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে হানিকুইন, জায়েন্টকি এবং এমডি-২। বর্তমানে উপজেলায় ৪২৫ হেক্টর জমিতে আনারসের চাষ হচ্ছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে উৎপাদন প্রায় ১৬ টন।
বছরে প্রায় ৫ দশমিক ৬ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে কৃষকেরা আয় করছেন প্রায় ১৩ কোটি টাকা। তবে এর মধ্যে স্বাদ ও মিষ্টতার কারণে ‘হানিকুইন’ সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। ভরা মৌসুমে প্রতিদিন ভোর থেকে শত শত ঠেলাগাড়ি ও ছোট যানবাহনে করে আনারস শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন বাজারে আসে। স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে এসব আনারস ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, রমজান উপলক্ষে পাইকারি বাজারে ব্যাপক বেড়েছে। একসময় মৌসুমি ফল হিসেবে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে শ্রীমঙ্গলে প্রায় সারা বছরই কম বেশি আনারস উৎপাদিত হচ্ছে। তবে রমজান মাসে এর চাহিদা দিগুণ বাড়ে।
ব্যবসায়ী সুত্রে জানা গেছে, সরবরাহ ভালো থাকায় পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়েই বেচাকেনা জমজমাট। দামও তুলনামূলকভাবে ভালো থাকায় কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন। আনরাস চাষিরা জানান, আনারস পচনশীল ফল হওয়ায় সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকাই কৃষকদের প্রধান সমস্যা।
মৌসুমে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ ফল পাকতে শুরু করলে বাজারে সরবরাহ বেড়ে যায় এবং অনেক সময় কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, চায়ের পর শ্রীমঙ্গলের সবচেয়ে পরিচিত ফসল এখন আনারস। প্রণোদনার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি সহায়তা ও মানসম্মত চারা সরবরাহের মাধ্যমে এ অঞ্চলে আনারস চাষ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শ্রীমঙ্গলে বছরে প্রায় ৬ হাজার ৮২১ মেট্টিক টন আনারস উৎপাদিত হয়। হেক্টর প্রতি গড় উৎপাদন প্রায় ১৬ মেট্টিক টন। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, শ্রীমঙ্গলের জলবায়ু ও মাটি আনারস চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বাজার সুবিধা ও উচ্চমূল্যের কারণে কৃষকেরা এ ফসলে আগ্রহী হচ্ছেন এবং লাভবান হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিত সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলা গেলে শ্রীমঙ্গলের আনারস শুধু মৌসুমি ফল হিসেবেই নয়, বরং দেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিমুখী পণ্যে পরিণত হতে পারে। পুষ্টিগুণেও ভরপুর ‘হানিকুইন’ আনারস এখন শুধু একটি ফল নয় বরং শ্রীমঙ্গলের অর্থনীতির এক সম্ভাবনাময় ব্র্যান্ড বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ আলাউদ্দিন বলেন, শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ি টিলায় আনারসের ভালো ফলন হয়েছে। আমরা কৃষকদের পরামর্শহ নানাভাবে সহযোগিতা করছি।
এ অঞ্চলের আনারস স্থানীয় চাষিদের আয়ের নতুন দ্বার খুলে দিয়েছে। আনারস চাষে কৃষকদের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ নিঃসন্দেহে দেশের কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এটি শুধু কৃষকদের আয় বৃদ্ধি করবে না, বরং দেশের পুষ্টি চাহিদা মেটাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

