AB Bank
  • ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬,

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad QR Code
BBS Cables
Janata Bank
  1. জাতীয়
  2. রাজনীতি
  3. সারাবাংলা
  4. আন্তর্জাতিক
  5. অর্থ-বাণিজ্য
  6. খেলাধুলা
  7. বিনোদন
  8. শিক্ষা
  9. তথ্য-প্রযুক্তি
  10. অপরাধ
  11. প্রবাস
  12. রাজধানী

‘আলু চাষ করে যেন পাপ করেছি’ বলছেন আলুচাষিরা


Ekushey Sangbad
জেলা প্রতিনিধি, জয়পুরহাট
০৭:০৩ পিএম, ২ মার্চ, ২০২৬

‘আলু চাষ করে যেন পাপ করেছি’ বলছেন আলুচাষিরা

উত্তরাঞ্চলের কৃষিনির্ভর জেলা জয়পুরহাটে চলতি মৌসুমে আলুর বাম্পার ফলন হলেও বাজারে দামের ভয়াবহ ধসে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। মাঠে সোনালি স্বপ্নের মতো ফলন হলেও ন্যায্যমূল্য না পেয়ে হতাশা আর ক্ষোভে ভেঙে পড়েছেন তারা।

অনেক কৃষকের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে গভীর আক্ষেপ- “আলু চাষ করে যেন পাপ করেছি।" ফলনের প্রাচুর্য যেন তাদের জন্য আশীর্বাদ নয় বরং এক অদৃশ্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কৃষক ও স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে এক বিঘা জমিতে আলু আবাদ করতে গড়ে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। বীজ কিনতেই খরচ হয়ে যায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। সার ও কীটনাশকে লাগে আরও ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা।

জমি প্রস্তুত, রোপণ, নিড়ানি ও উত্তোলনসহ শ্রম ব্যয়ে গুনতে হয় কমপক্ষে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। সেচ ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনায় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা এবং পরিবহন, বাছাই ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে আরও কয়েক হাজার টাকা যোগ হয়। সব মিলিয়ে উৎপাদন ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকায়।

অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এ বছর বিঘাপ্রতি ৭৫ থেকে ৮৫ মণ পর্যন্ত ফলন হয়েছে, যা উৎপাদনের দিক থেকে সন্তোষজনক। কিন্তু পাইকারি বাজারে কেজিপ্রতি দাম ৮ থেকে ১২ টাকার মধ্যে থাকায় মোট বিক্রি দাঁড়াচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার বেশি নয়। ফলে বিঘাপ্রতি ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে চাষিদের।

কালাই উপজেলার হাজিপাড়া মাঠে সরেজমিনে দেখা গেছে, নারী শ্রমিকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন আলু উত্তোলনের কাজে। প্রতি শতকে তিন থেকে সাড়ে তিন মণ ফলন হলেও কৃষকদের মুখে নেই আনন্দের ছাপ। মাঠের ফলন আর বাজারদরের মধ্যে তৈরি হয়েছে বিশাল ফারাক। উৎপাদনের খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

কৃষক আব্দুল মজিদ জানান,গত বছর তিন বিঘা জমিতে আলু চাষ করে প্রায় ২৭ হাজার টাকা লোকসান হয়েছিল।সেই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার আগেই এ বছর দুই বিঘা জমিতে আবার আলু আবাদ করেন।সার,বীজ, সেচ ও শ্রমিক ব্যয় মিলিয়ে তার খরচ হয় ৬৫ হাজার টাকা।

ফলন হয় ১৬০ মণ।কিন্তু প্রতিমণ মাত্র ২২০ টাকা দরে বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় মোট বিক্রি হয়েছে ৩৫ হাজার ২০০ টাকা।প্রায় ৩০ হাজার টাকা লোকসান গুনে তিনি এখন দিশেহারা। তার আশঙ্কা, এমন অবস্থা চলতে থাকলে অনেক কৃষকই চাষাবাদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন।

আরেক কৃষক ফিরোজ মিয়া জানান, গত বছর ছয় বিঘা জমিতে আলু আবাদ করে মৌসুমের শুরুতে দাম কম থাকায় লাভের আশায় সব আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে বাজারদর না বাড়ায় সংরক্ষণ খরচসহ আরও লোকসান গুনতে হয়। এবার সাড়ে চার বিঘা জমিতে আবাদ করে তিনি কমপক্ষে এক লাখ টাকা লোকসানের আশঙ্কা করছেন।তাই যেকোনো দামে এবার আলু বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

মোলামগাড়ীহাট এলাকার কৃষক তসলিম উদ্দিন ধারদেনা করে পাঁচ বিঘা জমিতে এলুয়েন্ট ও রেনমি জাতের আলু লাগিয়েছেন। ফলন ভালো হলেও কম দামের কারণে উৎপাদন খরচ ওঠার সম্ভাবনা নেই। ঋণ পরিশোধ নিয়ে তিনি গভীর দুশ্চিন্তায় আছেন।

পুনট এলাকার কৃষক মতিন আগাম জাতের আলু বিক্রি করেও বিঘাপ্রতি ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা লোকসান করেছেন। উদয়পুর এলাকার কৃষক ইদ্রিস আলী ২৫ বিঘা জমিতে আলু চাষ করে প্রতিমণ ২৭০ টাকায় বিক্রি করছেন, তাতেও বিঘাপ্রতি ১০ থেকে ১৩ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে বলে জানিয়েছেন। তিনি আলু রপ্তানি বাড়ানোর দাবি তুলেছেন।

এদিকে কালাই পৌরশহরের শিমুলতলীতে অবস্থিত আর বি স্পেশালিস্ট কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপক সেলিম হোসেন জানান, গত বছর দাম কম থাকায় অনেক কৃষক আলু তুলতে আসেননি। এতে কোল্ড স্টোরেজ মালিকদেরও লোকসান হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে এবার অর্ধেক ভাড়া আগাম নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সংরক্ষণ খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকেরা সেখানে আলু রাখতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।

সবজি রপ্তানিকারক আব্দুল বাসেদ বলেন, দেশের অন্যান্য সবজি বিদেশে রপ্তানি হলেও আলুর রপ্তানি কার্যত নেই। কয়েক বছর আগে সরকার আলু রপ্তানিতে ২০ শতাংশ প্রণোদনা দিলেও বর্তমানে তা ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে অতিরিক্ত উৎপাদিত আলু পুরোপুরি দেশীয় বাজারেই থেকে যাচ্ছে এবং সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কমে যাচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে আলু আবাদ হয়েছে।আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় রোগবালাই তুলনামূলক কম এবং ফলন ভালো হয়েছে। কৃষকেরা মিউজিকা,ডায়মন্ড, এস্টারিক্স, ক্যারেজ, কার্ডিনাল,রোজেটা,এলুয়েন্ট সানসাইন, ভ্যালেনসিয়া, রেনমি, গ্র্যানুলা, লেভান্তেসহ বিভিন্ন জাতের আলু আবাদ করেছেন।

তবে উৎপাদনের তুলনায় সংরক্ষণ সুবিধা সীমিত। জেলায় ১৯টি হিমাগারে সর্বোচ্চ প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ১০৪ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করা সম্ভব, যা মোট উৎপাদনের তুলনায় অনেক কম।

জেলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহ- সভাপতি শামস মতিন মনে করেন, সহজ শর্তে ও কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে আলুভিত্তিক নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠবে এবং রপ্তানি বাড়বে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ কে এম সাদিকুল ইসলাম বলেন, আলুভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলা গেলে স্থানীয়ভাবে নতুন বাজার সৃষ্টি হবে এবং কর্মসংস্থান বাড়বে।এতে করে কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত আলুর ন্যায্যমূল্য পেতে সক্ষম হবেন।

উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল আলু নিয়ে জয়পুরহাটের কৃষকদের এই সংকট কেবল একটি মৌসুমের সমস্যা নয়, বরং পরিকল্পনাহীন উৎপাদন, সীমিত সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও দুর্বল রপ্তানি ব্যবস্থার সামগ্রিক প্রতিফলন। মাঠভরা ফলন থাকলেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার বেদনায় কৃষকের মুখে আজ একটাই কথা—আলু চাষ করে যেন তারা অপরাধই করে ফেলেছেন।

 

একুশে সংবাদ/ওজি

Link copied!