সরকার বদলায়, এমপি বদলায়, শাসক বদলায়। কিন্তু কুড়িগ্রামের মানুষের ভাগ্য যেন বছরের পর বছর একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। নদী ভাঙ্গন আর কর্মসংস্থানের অভাবে প্রতিদিন সংগ্রামের মধ্য দিয়েই জীবন কাটছে এ জেলার মানুষের। তবে এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন করে আশার আলো দেখছেন এ জনপদের সাধারণ মানুষেরা।
কুড়িগ্রাম মানেই নদীর সঙ্গে নিরন্তর যুদ্ধ। কখনো ব্রহ্মপুত্র, কখনো ধরলার ভয়াল ভাঙ্গনে প্রতি বছর সর্বশান্ত হয় শত শত পরিবার। চোখের সামনে ভেসে যায় বসতভিটা, ফসলি জমি আর জীবনের শেষ সম্বল। বর্ষা এলেই আতঙ্কে কাটে দিন-রাত। রাতের আঁধারে নদী গিলে খায় ঘরবাড়ি। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রে দিন কাটাতে বাধ্য হয় অসংখ্য পরিবার।
নদী ভাঙ্গনের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের অভাব কুড়িগ্রামের আরেক বড় সংকট। কাজের সন্ধানে যুব সমাজ পাড়ি জমাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলা কিংবা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে। পরিবার ছেড়ে অনিশ্চিত জীবনে পা বাড়াচ্ছে তারা। অথচ এই জনপদের মানুষ ত্রাণনির্ভর জীবন চায় না। তারা চায় টেকসই নদীশাসন, স্থায়ী বাঁধ এবং নিজ জেলাতেই কর্মসংস্থানের সুযোগ।
কিন্তু বছরের পর বছর এসব দাবি আর চাওয়া রয়ে গেছে শুধু প্রতিশ্রুতির তালিকায়। নির্বাচন এলেই আশ্বাস, নির্বাচন শেষ হলেই নীরবতা, এমন অভিজ্ঞতা কুড়িগ্রামের মানুষের নতুন নয়। তবুও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আবারও স্বপ্ন দেখছেন তারা। তাদের প্রত্যাশা, এবার এমন জনপ্রতিনিধি পাবেন, যিনি শুধু নির্বাচনের সময় নয়, সারা বছরই মানুষের পাশে থাকবেন।
নদীভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্রহ্মপত্র নদীর পাড়ের আলমগীর মিয়া বলেন, এই নদী সব নিয়ে যায়, ঘর, জমি, স্বপ্ন। এ বছরও এখানকার অসংখ্য পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। সরকার বদলায়, কিন্তু আমাদের দুঃখ থেকে যায়। আমরা শুধু নিরাপদে বাঁচতে চাই।
কুড়িগ্রাম ধরলা নদীর পূর্ব পাড়ের নুরজামাল মিয়া বলেন, আমরা নিজের জেলাতেই কাজ চাই। আর বাইরে গিয়ে পরিবার ছেড়ে জীবন নষ্ট করতে চাই না। যদি এখানে কাজ থাকতো, কেউ ভিন জেলায় যেতো না।
একই এলাকার সেলিম মিয়া বলেন, আপাতত আমার কোন কর্ম নাই। এখানে কোন কাজ যে করবো তাও নেই। কাজ করতে হলে ঢাকা যেতে হয়। এবার তো নতুন সরকার আসবে, এই সরকার যেন আমাদের নিজ এলাকাতেই কাজের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয় এই প্রত্যাশা।
কুড়িগ্রাম জেলা নির্বাচন অফিস সুত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রামের চারটি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ১৮ লাখ ৭৬ হাজারের বেশি। এর মধ্যে নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষের চেয়েও বেশি।
নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ১০দিন। এরই মধ্যে নির্বাচনী বিলবোর্ড, মাইকিং আর সভা-সমাবেশে মুখর কুড়িগ্রামের ৪টি সংসদীয় আসন। ভোটের মাঠে নেমেছেন প্রার্থীরাও। আর নদীভাঙ্গনে ক্লান্ত, সংগ্রামী এই জনপদের মানুষ বুকভরা আশা নিয়ে অপেক্ষা করছে, এই নির্বাচন হয়তো তাদের জীবনে সত্যিকারের পরিবর্তন আনবে।
কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইয়েদ আহমেদ বাবু বলেন, স্বাধীনতা পরবর্তী সরকার গুলো এই জেলার উন্নয়নে দৃশ্যমান কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে আমার জানা নেই। এ জেলার সবচেয়ে বড় সমস্যা নদী ভাঙ্গন, এই সমস্যা নিরসনে এখানকার জনপ্রতিনিধিরা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, জুলাই পরবর্তী সরকার আসার পর এই জেলায় জেলা প্রশাসক নুসরাত সুলতানা যোগদানের পর তিনি ঐকান্তিক প্রচেষ্টা চালিয়ে ছিলেন নদী ভাঙ্গন রোধে কার্যকরী পদক্ষেপের মাধ্যমে।
এই এলাকার মানুষও স্বপ্ন দেখছিলেন। তিনি বদলী হলে আবারও হতাশায় ভোগেন জেলার মানুষজন। এখন আবারও আশা করছেন নতুন সরকার ও নতুন জনপ্রতিনিধি এলে হয়তো জেলার মানুষের ভাগ্য বদলাতে কাজ করবেন তারা।
কুড়িগ্রাম-২ আসনের বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ বলেন, আমি কুড়িগ্রামের সার্বিক উন্নয়ন করতে চাই। আমাদের এলাকা দীর্ঘদিন ধরে নদী ভাঙ্গনের ঝুঁকিতে রয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত নদী ভাঙ্গন রোধে কোনো পরিকল্পিত নদীশাসন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়নি।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

