পৌষ সংক্রান্তি ও নবান্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে মৌলভীবাজারের শেরপুরে অনুষ্ঠিত হয়েছে দেড় শতাব্দি পুরনো ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা।
গত সোমবার রাত থেকে সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নের শেরপুর এলাকার কুশিয়ারা নদীর তীরে শুরু হওয়া এই মেলাটি আজ বুধবার ভোরে শেষ হয়েছে।
মেলায় পাইকারি ও খুচরা মিলিয়ে অন্তত ৬ কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয়েছে। ৮৫ কেজি ওজনের একটি বাঘাইড় মাছ এক লাখ ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা জানিয়েছেন চাঁনপুর মৎস্য আড়তের ইকবাল হোসেন।
মাছ ব্যবসায়ী নছির আলী জানান, পাইকারি মাছ বিক্রির জন্য শেরপুর বাজারের ২০-২১টি মাছের আড়ত অস্থায়ী মোকামে এ বছর অন্তত ৪-৫ কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয়েছে। সোমবার মধ্যরাত পর্যন্ত ১৮ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করেছেন। মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত ৫০-৫৫ লাখ টাকার মাছ বিক্রির প্রত্যাশা করছেন। মেলায় আসা ১৯টি আড়ত মালিকের অনেকে ১০ লাখ থেকে ৪০ লাখ টাকার মাছ অনায়াসে বিক্রি করছেন।
ব্যবসায়ী দুলন মিয়া কুশিয়ারায় ধরা পড়া ৩৫ কেজি ওজনের বোয়ালের দাম চেয়েছেন ৮৫ হাজার টাকা। মাছ ব্যবসায়ী ইমরান হোসেন ৫৫ কেজি ওজনের বোয়াল মাছের দাম হাঁকছিলেন আড়াই লাখ টাকা। কিশোরগঞ্জ থেকে আসা মাছ ব্যবসায়ী সাহান আহমেদ বলেন, এটি দেশের অন্যতম বড় মাছের মেলা। প্রতিবছর এখানে এসে পাইকারিভাবে মাছ বিক্রি করি। মৎসজীবী বকুল পাল জানান, প্রায় ৩০ বছর ধরে এই মেলায় মাছ কেনাবেচা করছেন তিনি।
ঐতিহ্য, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির মিলনমেলায় পরিণত হওয়ায় প্রতিবছরের মতো এবারও মেলায় ব্যাপক মানুষের সমাগম ঘটে। হাজার হাজার ক্রেতা-বিক্রেতার উচ্ছ্বসিত উপস্থিতিতে ১২ জানুয়ারি দিবাগত রাত থেকে শুরু হওয়া মেলা গতকাল ভোর পর্যন্ত চলেছে।
প্রশাসন সুত্রে জানা গেছে, এ মেলায় জেলা প্রশাসনের রাজস্ব আয় হয়েছে ৯ লাখ টাকার অধিক। গত বছর এক দিনের মেলার ইজারামূল্য তিন লাখ টাকার মধ্যে ছিল। এ বছর ইজারামূল্য ৭ লাখ টাকার অধিক। আয়কর ভ্যাট মিলে ৯ লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এ বছর মেলাটি যেন ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে।
মৌলভীবাজারসহ পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে আগত ক্রেতা-বিক্রেতার পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের উপস্থিতি মেলাটিকে দিয়েছে নতুন পরিচিতি। বড় মাছ বরাবরের মতোই মেলার প্রধান আকর্ষণ। বাঘাড়, বোয়াল, আইড়, চিতল, কাতল, রুই, সিলভার কার্পসহ নানা প্রজাতির বড় মাছ শোভা পাচ্ছে মেলায়।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার (তৎকালীন মহকুমা) কুশিয়ারা নদীর তীরবর্তী মনুমুখে পৌষসংক্রান্তি উপলক্ষে মাছের মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। পৌষ সংক্রান্তি ও নবান্ন উপলক্ষে হাওর-বিল ও নদী থেকে আহরিত দেশীয় মাছ নিয়ে মৎসজীবী ও ব্যবসায়ীরা এখানে জড়ো হন।
নদীভাঙনের কবলে পড়ে মনুমুখ অস্তিত্ব সংকটের কারণে অর্ধশতাধিক বছর আগে একই নদীর তীরের এ উপজেলার শেরপুর মৌজায় মেলাটি স্থানান্তরিত করা হয়। এরপর থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মাছ ব্যবসায়ীদের উপস্থিতিতে মেলাটি পরিণত হয় বৃহৎ পাইকারি ও খুচরা বাজারে। বর্তমানে সিলেট-ঢাকা আঞ্চলিক মহাসড়কের শেরপুর বাজারের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের ধান ক্ষেতে মেলাটি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলার হামরকোনা, দাউদপুর, বাহাদুরপুরসহ বিভিন্ন গ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ জেলা প্রশাসনের অনুমতিক্রমে যুগ যুগ ধরে পৌষসংক্রান্তি উপলক্ষে মাছের মেলা এখানে আয়োজন হয়ে আসছে।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) রাজিব আহমদ জানান, কুশিয়ারা নদীর ইজারামূল্য এ বছর ৭ লাখ এক হাজার ৫০০ টাকা। মেলায় মাছের পাশাপাশি কৃষিপণ্য, শিশুদের খেলনা ও শৌখিন পণ্যের দোকানও বসেছে।
মাছের মেলার সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখতে এবং আগত ব্যবসায়ী, ক্রেতা সাধারণের নিরাপত্তায় সার্বক্ষণিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দায়িত্ব পালন করছে।
মৌলভীবাজার মডেল থানার ওসি মো. সাইফুল ইসলাম জানান, মেলাকে ঘিরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন ছিল। মেলা চলাকালীন পরিদর্শনে আসেন মৌলভীবাজার জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন।
এদিকে জেলার শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলায়ও উৎসবমুখর পরিবেশে মাছের মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় ছিল।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

