ঢাকা শুধু মিনার, মসলিন কিংবা ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের শহর নয়; এটি সুফি-সাধক ও আউলিয়াদের পদচারণায় পবিত্র হয়ে ওঠা এক প্রাচীন আধ্যাত্মিক জনপদ। বুড়িগঙ্গার তীরে যখন আজকের মতো নগরজীবনের কোলাহল গড়ে ওঠেনি, চারদিকে ছিল ঘন বনভূমি আর বিস্তীর্ণ জলাভূমির আধিপত্য-সেই সময়েই ইসলামের শান্তি, মানবতা ও আধ্যাত্মিকতার চিরন্তন বাণী নিয়ে এ ভূখণ্ডে আগমন ঘটেছিল একদল মহান সাধকের।
তাঁদের ত্যাগ, সাধনা ও কর্ম আজও এই নগরীর ইতিহাসে গভীরভাবে প্রোথিত, যদিও আধুনিকতার ব্যস্ততায় তাঁদের স্মৃতি ক্রমেই আড়ালে চলে যাচ্ছে।
সেইসব মহাপুরুষদের মধ্যে শাহ নি’য়ামতুল্লাহ বুদ-সেকান্দ এবং শাহ জালাল দাখিনী বিশেষভাবে স্মরণীয়। রাজধানীর দিলকুশা ও বঙ্গভবন এলাকার নীরব পরিবেশে আজও যেন তাঁদের জীবন, সাধনা ও ঐতিহ্যের অদৃশ্য উপস্থিতি অনুভূত হয়। কিন্তু সময়ের প্রবাহ ও ইতিহাসের নানা পরিবর্তনের কারণে তাঁদের প্রকৃত পরিচয় ও অবদান আজ অনেকটাই বিস্মৃতপ্রায়।
বুদ-সেকান্দ: সত্যের এক অলৌকিক ইশারা
ঢাকার প্রাচীন ইতিহাসের পাতা উল্টালে শাহ নি’য়ামতুল্লাহর নাম পাওয়া যায় এক রহস্যময় ও প্রভাবশালী ধর্মপ্রচারক হিসেবে। জনশ্রুতি আছে বঙ্গে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার বহু আগেই তিনি ঢাকা অঞ্চলে পদার্পণ করেছিলেন। তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত ‘বুতশিকন’ বা ‘মূর্তি চূর্ণকারী’ উপাধিটি এক আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্বের স্মারক।
জনশ্রুতি রয়েছে যে, একদিন ধ্যানেরত এই সাধকের ইবাদতে বিঘ্ন ঘটানোর উদ্দেশ্যে এক মূর্তিসহ শোভাযাত্রা তাঁর আস্তানার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তখন তাঁর ক্রুদ্ধ দৃষ্টি আর অঙ্গুলের ইশারায় মাটির মুর্তিগুলো নিজে নিজেই ভেঙে চূর্ণ হয়ে যায়।
লোককথা অনুযায়ী, এই অলৌকিক ঘটনায় বিমোহিত হয়ে হাজারো মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে। সেখান থেকেই তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘বুদ- সেকান্দ’ উপাধি। বুদ- সেকান্দ এর মানে হলো বুজুর্গানের পবিত্র দৃষ্টি নিক্ষেপের মাধ্যমে দেব-দেবীর মূর্তি অলৌকিকভাবে ভেঙে যেতো। এখনো পুরানা পল্টনের দিলকুশায় রয়েছে তাঁর মাজার। শান্তভাবে পরে থাকা তাঁর মৌন সমাধি এখন কেবলই ঢাকার প্রাচীন ইসলামি ঐতিহ্যের এক নীরব সাক্ষী।
শাহ জালাল দাখিনী: সুলতান ও সুফির এক ট্র্যাজিক আখ্যান
শাহ নি’য়ামতুল্লাহর পরবর্তী সময়ে বাংলায় আগমন ঘটে শাহ জালাল দাখিনীর। তিনি ছিলেন দক্ষিণ ভারতের গুজরাটের এক প্রভাবশালী সাধক। তাঁর আগমন ছিল রাজকীয় আভিজাত্যে ঘেরা। তাঁর শিষ্যদের শৃঙ্খলিত জীবনযাপন এবং খানকাহর জাঁকজমক তৎকালীন বাংলার সুলতান রুকনুদ্দীন বরবক শাহের মনে সন্দেহের দানা বাঁধে।
লোককথা অনুযায়ী, ইতিহাসের এক নিষ্ঠুর পরিহাসে কোনো এক ষড়যন্ত্রকারীর প্ররোচনায় সুলতান মনে করেছিলেন এই সুফি সাধক হয়তো রাজশক্তি দখল করতে চান। ফলস্বরূপ ১৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে সুলতানি বাহিনীর হাতে শাহ জালাল দাখিনী এবং তাঁর অসংখ্য মুরিদ শাহাদাত বরণ করেন।
‘আখবারুর আখইয়ার’ গ্রন্থ প্রণেতা ও হাকিম হাবিবুর রহমান সাহেবের মতে ঢাকার গভর্নমেন্ট হাউস (বঙ্গভবন) এলাকার মধ্যে তিনি শাগরিদগণসহ সমাহিত আছেন।
মওলানা আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলবী লিখিত ‘আখবারুর আখইয়ার’ গ্রন্থে উল্লিখিত হয়েছে যে, তিনি উত্তর ভারতের স্বনামধন্য সূফী শায়খ সলীম চিশতীর বিখ্যাত বাঙালি শাগরিদ শায়খ পিয়ারার কাছে শিক্ষা লাভ করেছিলেন।
হজরত শাহ জালাল দাখিনীকে বঙ্গভবনের প্রধান ফটকের পাশে দাফন করা হয়। আর মোগল আমলেই বর্তমান রাজউক ভবনের পাশে ‘শাহ জালাল দাখিনী মসজিদ’টি নির্মাণ করা হয়।
সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলো, স্থাপত্য ও স্মৃতির এই প্রবাহে আমরা আমাদের শেকড়কে ভুলতে বসেছি। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ভবনের পাশে যে প্রাচীন তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি দাঁড়িয়ে আছে, সেটি মোগল স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। ১৮৯০ সালের আলোকচিত্রে এই স্থাপনাটিকে স্পষ্টভাবে ‘হযরত শাহ জালাল দাখিনি মসজিদ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এমনকি ঢাকার নবাব আহসানউল্লাহ এই মসজিদের ব্যাপক সংস্কার করেছিলেন এবং নবাব পরিবারের মেহের বানু ও জেনারেল খাজা ওয়াসিউদ্দীনসহ অনেকের অন্তিম শয়তান এখানেই হয়েছে।
দুঃখজনকভাবে, কালক্রমে এই মসজিদের আদি পরিচয় মুছে ফেলে এর নাম রাখা হয়েছে ‘দিলকুশা জামে মসজিদ (নওয়াববাড়ি)’। নামের এই পরিবর্তন কেবল একটি শব্দবদল নয়। বরং এটি দুজন সুফি সাধকের স্মৃতিকে জনমানস থেকে বিচ্ছিন্ন করার এক প্রচ্ছন্ন প্রক্রিয়া। যদিও মসজিদের আঙিনায় শাহ নি’য়ামতুল্লাহর মাজার আজও টিকে আছে। কিন্তু মসজিদের আদি নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সুলতানি ও মোগল আমলের সেই যোগসূত্রটি আজ দুর্বল।
একটি জাতি তার স্থাপত্য আর আধ্যাত্মিক পুরুষদের হাত ধরেই বেঁচে থাকে। শাহ নি’য়ামতুল্লাহ বুতশিকন এবং শাহ জালাল দাখিনী কেবল ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব নন। তাঁরা ঢাকার সমাজ-সংস্কৃতির বিবর্তনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাজউকের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদটি কিংবা বঙ্গভবনের অভ্যন্তরে ঘুমিয়ে থাকা সুফি সাধকের সমাধি আমাদের মনে করিয়ে দেয় অত্যাধুনিক এই মহানগরের কংক্রিটের নিচেই চাপা পড়ে আছে এক সহস্রাব্দ প্রাচীন আধ্যাত্মিক জনপদ।
ইতিহাস সংরক্ষণের দাবি কেবল দালানকোঠা রক্ষা করা নয়। বরং সেই দালানের গায়ে লেগে থাকা সত্য ও নামের শুদ্ধতা বজায় রাখাও জরুরি। আমাদের উচিত এই বিস্মৃতপ্রায় অধ্যায়গুলোকে পাঠ্যপুস্তক ও নাগরিক আলোচনায় ফিরিয়ে আনা। যাতে অনাগত প্রজন্ম জানতে পারে কোন ত্যাগের বিনিময়ে এই জনপদে সভ্যতার প্রদীপ জ্বলে উঠেছিল।
সূত্র: ১. মুসলিম আমলে বাংলার শাসনকর্তা-আসকর ইবনে শাইখ
২. বাংলাদেশে ইসলাম- আব্দুল মান্নান তালিব
৩. প্রথম আলো
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

