AB Bank
  • ঢাকা
  • শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬,

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad QR Code
BBS Cables
Janata Bank
  1. জাতীয়
  2. রাজনীতি
  3. সারাবাংলা
  4. আন্তর্জাতিক
  5. অর্থ-বাণিজ্য
  6. খেলাধুলা
  7. বিনোদন
  8. শিক্ষা
  9. তথ্য-প্রযুক্তি
  10. অপরাধ
  11. প্রবাস
  12. রাজধানী

ছুটির দিনে ঘুরে আসুন ষাট গম্বুজে


Ekushey Sangbad
পর্যটন ডেস্ক
০৪:২৯ পিএম, ১০ জুন, ২০২৬

ছুটির দিনে ঘুরে আসুন ষাট গম্বুজে

ব্যস্ত নগরজীবনের যানজট আর কোলাহলে হাঁপিয়ে উঠলে ছুটির দিনে ঘুরে আসতে পারেন সবুজে ঘেরা কোনো নির্জন প্রান্তরে। আর যদি প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ছোঁয়া খুঁজে নিতে চান, তবে গন্তব্য হতে পারে বাগেরহাটের ঐতিহাসিক ষাট গম্বুজ মসজিদ।

মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন এই মসজিদ আজও মাথা উঁচু করে বহন করছে খান জাহান আলী-এর স্মৃতি ও কীর্তি।

যানজটে বন্দী শহুরে জীবনে অনেক দিন ধরেই যেন দম বন্ধ হয়ে আসছিল। ঢাকার বাইরে কোথাও যাওয়া হচ্ছিল না, প্রকৃতির সান্নিধ্যও পাওয়া হচ্ছিল না। খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে গভীরভাবে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ যেন হারিয়েই গিয়েছিল।

এক বিকেলে ঘরের কাজ সেরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ মোবাইল ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল রাশিদা আপার নাম। ফোন ধরতেই তিনি বললেন, “গ্রামের বাড়ি যাবি? ব্যাগ গুছিয়ে চলে আয়। সব ঠিক থাকলে কালই রওনা হব।”

‘গ্রামের বাড়ি’-শব্দ দুটো শুনেই মন ভরে গেল আনন্দে। খোলা আকাশ, সবুজ মাঠ আর নির্মল বাতাসের কথা মনে পড়ে গেল। তার ওপর রাশিদা আপার সঙ্গে ভ্রমণ মানেই নতুন কোনো অভিজ্ঞতা। তাই আর দেরি না করে রাজি হয়ে গেলাম।

পরদিন সকালে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে চলে গেলাম আপার বাসায়। দুপুর দুইটায় শুরু হলো আমাদের যাত্রা। নারায়ণগঞ্জ থেকে গাড়ি দ্রুত এগিয়ে চলল দক্ষিণাঞ্চলের পথে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক্সপ্রেসওয়ে ধরে এগোতে এগোতে চোখে পড়ল স্বপ্নের পদ্মা সেতু।

বহু প্রতীক্ষিত এই সেতু পেরিয়ে এটাই ছিল আমার প্রথম যাত্রা। দীর্ঘদিনের অপেক্ষা ও স্বপ্নের বাস্তব রূপ যেন চোখের সামনে ধরা দিল। মুহূর্তেই গাড়ি ছুটে চলল পদ্মার বুকের ওপর দিয়ে, আর আমি মুগ্ধ দৃষ্টিতে উপভোগ করতে লাগলাম বাংলাদেশের এক গৌরবময় অর্জনকে।

দীর্ঘদিন পর এমন একটা ভ্রমণ যাত্রা যেন অনেকটাই সতেজ করে তুলছে আমাদের। আর পুরো যাত্রাপথজুড়ে ভাগনে রাইশাদ ও রুহানের খুনসুটি আনন্দ দিয়েছে আমাদের। গোপালগঞ্জে যাত্রাবিরতি দিয়ে সন্ধ্যা ঠিক ৫টা ৩০ মিনিটে আমরা পৌঁছে গেলাম পিরোজপুর শহরে। গন্তব্য কাউখালী উপজেলার সয়না গ্রাম।

আগেই বলেছিলাম, আমাদের রাশিদা আপার সঙ্গে বের হওয়া মানেই অ্যাডভেঞ্চার। পিরোজপুর সদর থেকে সয়না যাওয়ার পথে হঠাৎই আপা বলে উঠলেন, ‘চল সবাই অষ্টম চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু ঘুরে আসি।’ যার আঞ্চলিক নাম ভেকুটিয়া সেতু। গাড়ি ঘুরিয়ে চলে গেলাম কচা নদীতীরে। সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের দৃশ্যটা সত্যিই অপরূপ ছিল।

পরের দিন পাখির কিচিরমিচির শব্দে খুব ভোরেই ঘুম ভাঙল। আমাদের বড় ভাগনে রাইশাদকে নিয়ে বের হয়ে বাড়ির পাশে বিস্তৃত সূর্যমুখী বাগান দেখে থমকে গেলাম। মাঠের পর মাঠ হলুদ সূর্যমুখী যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

সূর্যমুখী বাগান ঘুরে বাসায় এলাম। চট করে নাশতা সেরেই চলে গেলাম তিন নদীর মোহনায়। সন্ধ্যা, কচা ও কালীগঙ্গা নদী যেন একই বন্ধনে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। পরের দিন খুব ভোরে আপার ডাকে ঘুম ভাঙল। আপা বললেন, ‘খালে জোয়ার এসেছে, চল আমরা সবাই বেরিয়ে পড়ি। প্রথমে আমরা ট্রলারে ঘুরব; এর পর বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদে যাব।’ ব্যস,  মন সতেজ হতে আর কী লাগে। তাড়াতাড়ি নাশতা সেরে সবাই ট্রলারে উঠলাম।

ষাট গম্বুজ মসজিদটি বাংলাদেশের তিনটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মধ্যে একটি। মসজিদের গায়ে কোনো শিলালিপি না থাকলেও এর স্থাপনাশৈলী বলে দেয় এটি হজরত খান-উল-আজম-উলুঘ-খান-ই-জাহান আলী কর্তৃক নির্মিত।

হজরত খানজাহান আলী (রা.) এ দেশে এমন অনেক মসজিদ নির্মাণ করে ইসলাম প্রচার করেছেন। ছোটবেলায় বইয়ের পাতায় পড়া এই অপূর্ব স্থাপনাটি আজ নিজ চোখে দেখতে যাব। এই ভেবে আনন্দের আর সীমা থাকল না।

গাড়ি চলছে আপন গতিতে। বলেশ্বর নদী ও দাঁড়টানা নদী পেরিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদের সামনে। গাড়ি যথাস্থানে পার্ক করে জনপ্রতি ২০ টাকা টিকিট কেটে প্রবেশ করলাম।

মসজিদের গেট দিয়ে ঢুকতেই দেখতে পেলাম বাগেরহাট জাদুঘর। তিন গ্যালারিবিশিষ্ট একতলা ভবনের জাদুঘরটিতে ঢুকে বেশ কিছু পুরোনো মুদ্রা, তৈজসপত্র, মানচিত্র এবং বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষ থেকে পাওয়া স্মৃতিচিহ্ন চোখে পড়ল। জাদুঘরটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় জিনিস হচ্ছে কুমিরের মমি।

যতদূর জানা যায়, হজরত খান জাহান আলী (রা.) এর পালিত কুমির কালাপাহাড় বা ধলাপাহাড়ের মৃত শরীরকে মমি করে অথবা শুধু চামড়া দিয়ে এই ডামি বানানো হয়েছে। যদিও মাথাটি ছিল সম্পূর্ণই কৃত্রিম। জাদুঘরটিতে ঢুকতে কাটতে হবে জনপ্রতি ১৫ টাকা করে টিকিট। সপ্তাহে ৬ দিন খোলা থাকলেও প্রতি রোববার জাদুঘরটি পূর্ণ দিবস বন্ধ থাকে।

মসজিদটির নাম ষাট গম্বুজ হলেও এটি আসলে ৭০টি গোলাকার গম্বুজ, ৭টি চারচালা গম্বুজ ও ৪টি কর্নার বুরুজসহ মোট ৮১টি গম্বুজবিশিষ্ট একতলা মসজিদ। মসজিদটির ষাট গম্বুজ নামকরণের পেছনে একাধিক কথা প্রচলিত আছে।

কেউ কেউ বলেন, সারিবদ্ধভাবে সাতটি করে গম্বুজ থাকায় এটি ষাট গম্বুজ নামকরণ করা হয়। আবার অনেকে বলেন, মসজিদটি ৬০টি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকায় এটির নাম দেওয়া হয় ‘ষাট খাম্বা’ মসজিদ; যা কালে কালে ষাট গম্বুজ হয়ে উঠেছে।

মসজিদটি ৮ ফুটের দেয়াল দ্বারা বেষ্টিত। পোড়ামাটির তৈরি টালিইট, চুন-সুরকি, পাথর দ্বারা নির্মিত মসজিদটি প্রশংসার দাবিদার। এতে রয়েছে পোড়ামাটির ফলক। কিবলা দেয়ালে বিশেষ একটি দরজা থাকলেও খিলান দরজা আছে ২৫টি।

বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ প্রাচীন আয়তাকার এ মসজিদটিতে রয়েছে ১০টি মেহরাব। মসজিদের চারদিকে সবুজ ঘাসে ঘুরে বেড়ালাম বেশ কিছুক্ষণ। গাছের নিচে বসে জিরিয়ে নিলাম। আর মসজিদের সামনে শিশুদের জন্য থাকা প্লে গ্রাউন্ড পেয়ে রাইশাদ, রুহানের তো আনন্দের অন্ত নেই।

এরপর গেলাম মসজিদের ঠিক পশ্চিম পাশে সুদীর্ঘ দিঘির দিকে। দিঘির বাঁধানো ঘাটের সিঁড়িতে বসে পা ভিজিয়ে নিলাম জলে। শ্যাওলাযুক্ত দিঘির পানিতে রয়েছে লাল শাপলা। মসজিদ থেকে ১০ মিনিটের দূরত্বে আছে হজরত খান জাহান আলি (রা.)-এর সমাধি। সেখানে বহু মানুষ আসেন তাদের ইচ্ছে পূরণের আশ্বাস নিয়ে, করে থাকেন মানতও।

মানুষের আশা পূরণের এই বিশ্বাস বহুযুগের। তাই এ জায়গাটিতে প্রতিদিন অনেক মানুষের সমাগম হয়। সমাধি স্থানের সামনে আছে একটি বিশাল দিঘি। দিঘির চারপাশে ঘনসবুজ গাছ। বলা হয় খান জাহান আলি (রা.) এই দিঘিতেই কুমির পালন করতেন।

যার ধারা এখনও বজায় আছে। সমাধিস্থলের বাইরে রয়েছে অনেকগুলো দোকান। দোকানগুলোয় গৃহস্থালির জিনিসপত্রসহ বাহারি ধরনের উপহার সামগ্রী পাওয়া যায়। সবগুলো দোকান ঘুরে এবার আমাদের ফেরার পালা।

কীভাবে যাবেন

ঐতিহাসিক ষাট গম্বুজ মসজিদ ভ্রমণ করতে চাইলে সহজেই ঢাকা থেকে বাগেরহাটে যেতে পারেন। বাসে যাতায়াতের ক্ষেত্রে জনপ্রতি ভাড়া সাধারণত ৪০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে। বাগেরহাট বাস টার্মিনালে পৌঁছে সিএনজি অটোরিকশা, অটো বা ভ্যানযোগে অল্প সময়েই পৌঁছে যাওয়া যায় ষাট গম্বুজ মসজিদ প্রাঙ্গণে। এছাড়া পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণের জন্য ঢাকা থেকে ব্যক্তিগত গাড়ি ভাড়া করেও যেতে পারেন।

ষাট গম্বুজ মসজিদ দর্শনের পাশাপাশি সময় করে ঘুরে দেখতে পারেন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, মোংলা বন্দর, রেজা খোদা মসজিদ, জিন্দা পীর মসজিদ, ঠান্ডা পীর মসজিদ, সিংগাইর মসজিদ, বিবি বেগুনি মসজিদ, চুনাখোলা মসজিদ, নয় গম্বুজ মসজিদ, কোদলা মঠ, রণবিজয়পুর মসজিদ এবং দশ গম্বুজ মসজিদ। এছাড়া অবকাশ যাপনের জন্য যেতে পারেন সুন্দরবন রিসোর্ট, বারাকপুর ও চন্দ্রমহল এলাকায়। ইতিহাস, স্থাপত্য ও প্রকৃতির সমন্বয়ে বাগেরহাট হতে পারে একটি পরিপূর্ণ ভ্রমণ গন্তব্য।।

 

একুশে সংবাদ/ওজি

Link copied!