বর্ষা মৌসুম এলেই পানিতে ভরে ওঠে সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল। টাঙ্গুয়ার হাওর, নীলাদ্রি লেক, যাদুকাটা নদী ও বারেক টিলাসহ জেলার দর্শনীয় স্থানগুলোতে এ সময় সাধারণত পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম দেখা যায়। তবে চলতি মৌসুমে সেই চেনা দৃশ্য অনুপস্থিত। ঈদের পরও প্রত্যাশিত সংখ্যক ভ্রমণপিপাসুর আগমন না ঘটায় হাউসবোট মালিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও স্থানীয় শ্রমজীবীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, বর্ষার শুরুতেই হাউসবোট ও নৌভ্রমণের বুকিং বাড়ার কথা থাকলেও এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। পর্যটক কম আসার পাশাপাশি হাওরে পানির পরিমাণও তুলনামূলক কম থাকায় ব্যবসা প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। তাদের আশঙ্কা, মৌসুমজুড়ে একই অবস্থা বিরাজ করলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।

টাঙ্গুয়ার হাওরসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, পর্যটন মৌসুমে ছোট নৌকায় চা, হালকা খাবার ও বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করে অনেক পরিবারের জীবিকা নির্বাহ হয়। এছাড়া স্থানীয়রা পর্যটকদের হাওরের বিভিন্ন অংশ ঘুরিয়ে দেখানো এবং লোকসংগীত পরিবেশন করেও আয় করেন। কিন্তু এ বছর পর্যটকের উপস্থিতি কম থাকায় তাদের আয়ের উৎসও সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
নীলাদ্রি লেক এলাকার একজন আলোকচিত্রী বলেন, অন্য বছর এ সময় পর্যটকদের ছবি তুলতে ব্যস্ত থাকতে হতো। এবার ক্যামেরা নিয়ে বের হলেও পর্যাপ্ত কাজ মিলছে না।
হাউসবোট পরিচালনাকারীরা জানান, আগের বছরগুলোতে এই সময় অধিকাংশ নৌযান আগাম বুকিং হয়ে যেত। কিন্তু এবার অনেক হাউসবোটই খালি পড়ে আছে। তাদের মতে, পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় পুরো খাতেই স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে পরিবেশবাদীরা বলছেন, পর্যটন শিল্পের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশগত ভারসাম্যও হুমকির মুখে পড়েছে। তাদের অভিযোগ, উচ্চ শব্দে গান, জেনারেটরের ব্যবহার, প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য ফেলার কারণে হাওরের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া বড় আকারের হাউসবোটের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সুনামগঞ্জ সচেতন কমিটির (সনাক) সদস্য খলিল রহমান বলেন, অতীতের তুলনায় হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনেকটাই কমে গেছে। পাখির সংখ্যা হ্রাস, গাছপালা নিধন এবং অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন কার্যক্রমের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমির পরিবেশ ঝুঁকির মুখে রয়েছে। হাওরের স্বাভাবিক পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
সুনামগঞ্জ হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওয়াবাদুল হক মিলনের মতে, একসময় ছোট নৌকাভিত্তিক পর্যটনই ছিল হাওরের প্রধান আকর্ষণ। বর্তমানে বিপুলসংখ্যক বড় হাউসবোট চলাচল করায় পরিবেশগত চাপ বেড়েছে। ফলে পর্যটনের পাশাপাশি হাওরের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তবে তাহিরপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান সাকিব বলেন, হাওরের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে প্রশাসন বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। হাউসবোট চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং উচ্চ শব্দে গান বাজানোসহ পরিবেশবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, চলতি মৌসুমে হাওরে পানি আসতে কিছুটা বিলম্ব হওয়ায় পর্যটকের সংখ্যা কম থাকতে পারে। পানি বৃদ্ধি পেলে পর্যটকদের আগমনও বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করেই হাওরভিত্তিক পর্যটন শিল্পকে টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে হবে।
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

