ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর, ২০২০, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
Ekushey Sangbad
Janata Bank
করোনাভাইরাস মোকাবিলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ৩১ নির্দেশনা

বরিশাল-ঢাকা নৌপথ পরিণত হচ্ছে আতঙ্কে


Ekushey Sangbad
জেলা প্রতিনিধি, বরিশাল
নভেম্বর ১৯, ২০২০, ১০:৫৪ এএম
বরিশাল-ঢাকা নৌপথ পরিণত হচ্ছে আতঙ্কে

রাজধানী ঢাকার সাথে বরিশালের আরাদায়ক রুট হচ্ছে নৌপথ। কিন্তু ক্রমশই যেন আরামদায়ক এ রুট অশান্ত হয়ে উঠছে। লঞ্চে ঘটছে একের পর এক হত্যা। শুধু হত্যাই নয় লঞ্চে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনাতো নিত্যদিনের। লঞ্চে একের পর এক হত্যাকান্ড নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। 

সর্বশেষ গত ১৭ নভেম্বর বিলাসবহুল এমভি সুন্দরবন-১১ লঞ্চের ছাদে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। নিহত যুবকের নাম শামীম হাওলাদার (২৪)। তিনি ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার কুশঙ্গল ইউনিয়নের কুপিলা গ্রামের বাসিন্দা খালেক হাওলাদারের ছেলে। তিনি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকার আবির ফ্যাশন নামে একটি গার্মেন্টের শ্রমিক ছিলেন। এর আগে ১৪ সেপ্টেম্বর বরিশালে আসা যাত্রীবাহী লঞ্চ পারাবত-১১ এর কেবিন থেকে গত সোমবার অজ্ঞাত এক নারী যাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। 

গত বছরের ২০ জুলাই বরিশালে এমভি সুরভী-৮ নামে একটি লঞ্চের স্টাফ কেবিন থেকে আঁখি নামে এক নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়। তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছিল। গত ২০১৮ সালের ৪ এপ্রিল বরিশালগামী পারাবত-৯ লঞ্চে সিফাত নামে এক তরুণকে দুর্বিত্তরা গলাটিপে হত্যার পর পেট কেটে নদীতে ফেলে দেয়। 

২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট ঢাকা থেকে বরিশালগামী পারাবাত-১০ লঞ্চ থেকে মিনারা বেগম নামে এক কেবিন যাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয়। যাত্রীদের নিরাপত্তায় বরাবর প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন নির্দেশনা দেয়া হলেও লঞ্চ কর্তৃপক্ষ এসব বিষয়ে কোন কর্নপাত করছেন না বলে মত দিয়েছেন সচেতন মহল। লঞ্চে একের পর এক হত্যার ঘটনায় লঞ্চগুলোর আনসার সদস্য, নিরাপত্তাকর্মী ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ করেছেন অনেক যাত্রী। লঞ্চে নাম মাত্র নিরাপত্তাকর্মী থাকলেও এরা কোন কাজে আসছে না। লঞ্চ ঘাট ত্যাগ করার পূর্বে এবং ঘাটের পৌঁছানোর পরে যাত্রীদের নামার সময় এদের তৎপরার দেখা গেলেও যখন লঞ্চ মাঝ নদীতে থাকে তখন আনসার ও নিরাপত্তাকর্মীদের কোন কার্যক্রম চোখে পড়ে না। যাত্রীদের সাথে বিভিন্ন সময় খারাপ ব্যবহারেরও অভিযোগ এমভি সুন্দরবনের আনসার সদস্যদের। সরেজমিনে বরিশাল লঞ্চঘাটে বেশ কয়েকদিন বিভিন্ন লঞ্চে দেখা যায় নানা অনিয়মের চিত্র। প্রায় প্রতিটি লঞ্চেই স্টাফদের কেবিনগুলো ভাড়া দেওয়া হয়, এমনকি আনসার সদস্যদের জন্য বরাদ্ধকৃত কেবিনগুলোও যাত্রীদের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়। 

সর্বশেষ সুন্দরবন-১১ লঞ্চের ছাদে যে ছাত্রীকে কুপিয়ে হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে তার পাশেই ছিলো নিরাপত্তাকর্মীদের কক্ষ, সেই কক্ষটিকেও টাকার বিনিময়ে ভাড়া দেওয়া হয়েছিলো বলে জানায় একাধিক যাত্রী। আনসার সদস্য/নিরাপত্তাকর্মীদের কেবিন ভাড়া দেওয়ার এই ঘটনা যেন প্রায় প্রতিটি লঞ্চেই ঘটে থাকে। 

নৌ পরিবহন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, প্রতিটি লঞ্চে আনসার সদস্য নিয়োগ এবং আগ্নেআস্ত্র রাখার জন্য বিভিন্ন সময় বলা হয়ে থাকে কিন্তু বেশি খরচের জন্য লঞ্চ মালিকরা এসব করছেন না, সার্ভের সময় আনসার সদস্যদের থাকার বিষয়টি লঞ্চ মালিকরা নিশ্চিত করছেন। বাকি সময়টা অপেশাদার লোকদের দিয়েই লঞ্চযাত্রীদের নিরাপত্তার কাজ করা হয় বলে জানা যায়। এই রুটে চালাচলকারী ২৮টি বেসরকারি যাত্রীবাহী লঞ্চের প্রায় সিংহভাগের একই চিত্র। অর্থাৎ আনসারের পরিবর্তে লঞ্চমালিকরা তাদের কর্মীদের দিয়ে নিরাপত্তার কাজটি চালিয়ে নিচ্ছেন। জানা যায়, প্রায় প্রতিটি লঞ্চেই আনসার সদস্য ছিলো যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য কিন্তু ২০১৪সালে আনসার সদস্যদের বেতন বৃদ্ধির পর থেকে একে একে প্রায় সব লঞ্চ থেকেই আনসার সদস্যদের বাদ দিয়ে দেয়া হয়। আনসার সদস্যদের বাদ দেয়ার পরে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ নামমাত্র কিছু নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দিয়েছেন, যাদের হাতে রয়েছে অস্ত্রের বদলে লাঠি, আর এই লাঠি দিয়েই তারা যাত্রীদের নিরাপত্তা দিয়ে থাকেন। মনির হাওলাদার নামে এক যাত্রী বলেন, লঞ্চের ছাদে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হলো কিন্তু লঞ্চের এতোগুলো নিরাপত্তাকর্মী কিছুই জানেনা, এটা কেমন কথা! এমন নিরাপত্তাকর্মী থাকার চেয়ে না থাকা ভালো। কোন লঞ্চে যাতায়াতের সময় নিরাপত্তাকর্মীদের কোন সহযোগীতা পাই নি। এদিকে লঞ্চের স্টাফদের বিরুদ্ধে যাত্রীদের সাথে খারাপ ব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। পারাবত, সুন্দরবন, সুরভী, এডভেঞ্জার লঞ্চে প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন যাত্রীদের সাথে খারাপ ব্যবহার করছেন। এমনকি বিভিন্ন সময় যাত্রীদের উপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। 

জাবেদ নামে এক যাত্রী বলেন, ‘২০১৯সালে পারাবত-১১ লঞ্চের একটি এসি সিঙ্গেল কেবিনে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হই। লঞ্চ ছাড়ার পর থেকেই উপর থেকে বিছানায় পানি পরতে শুরু করে। আমি কর্তব্যরত স্টাফকে জানালে তিনি বিষয়টি দেখছেন বলে জানায় পরে রাত ১১টায় সে এসে জানায় এখানের ইনচার্জ ঘুমিয়ে পরেছে বলে চলে যায়। সারা রাত আমি একটু ঘুমাতে পারিনি পানির জন্য। সকালে উঠে লঞ্চ থেকে বের হওয়ার সময় নিচে যারা টিকেট সংগ্রহের দায়িত্বে থাকে তাদের বিষয়টি অবগত করলেই তারা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে। আমাকে এক স্টাফ বলেন, কেবিন ভাড়া নিয়ে লঞ্চটা কিনে নিয়েছেন নাকি আপনি। তারা অনেক খারাপ ব্যবহার করে আমার সাথে।’ হাজার হাজার যাত্রী নিয়ে এসব লঞ্চগুলো দীর্ঘ ১৫০ কিলোমিটার নৌপথ পাড়ি দিলেও যাত্রীদের নিরাপত্তায় কোন কিছুই দেখা যায় না লঞ্চগুলোতে। সিংগভাগ লঞ্চেই ডেক ছাড়াও কেবিনের করিডর থেকে সিসির আশেপাশের জায়গাগুলোতেও অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে ছিট ভাড়া দেওয়া হয়। অনেক সময় যাত্রীবেশে কেবিনের পাশে ছিট ভাড়া নিয়ে কেবিন যাত্রীদের বিভিন্ন মালামাল চুরি ছিনতাই করছেন এক শ্রেণীর চক্র। দীর্ঘদিন ধরে এর বিরুদ্ধে যাত্রীরা প্রতিবাদ করে আসার পাশপাশি গণমাধ্যমে একাধিকবার সংবাদ প্রকাশ হলেও কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না লঞ্চ কর্তৃপক্ষ পাশাপাশি লঞ্চ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাও নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো। 

এছাড়া দক্ষিণের প্রায় সব লঞ্চগুলোতেই মাষ্টার ব্রিজ মানে যেখান থেকে লঞ্চ চালানো হয় সেই সংরক্ষিত এলাকাটিতেও ভাড়া দেওয়া হয় যাত্রীদের কাছে। সরেজমিনে দেয়া যায়, মাষ্টারব্রিজে চাঁদর বিছিয়ে ছিট বানিয়ে ভাড়া দেয় লঞ্চস্টাফরা। প্রতিটি মাষ্টারব্রিজে ৬ থেকে ১০জন যাত্রীদের টাকার বিনিময়ে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়, এতে যাত্রীদের কাছ থেকে ৪শ’ থেকে ৬শ’ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। 

সচেতন নাগরিক কমিটির নেতারা বলছেন, লঞ্চগুলো হাজার হাজার যাত্রী নিয়ে দীর্ঘ ১৫০ কিলোমিটার নৌপথ পাড়ি দেয়। এসব লঞ্চগুলোতে নেই  আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যার ফলে প্রায় ঘটছে ছোট বড় ঘটনা, এমনকি খুন-খারাবির মতো ঘটনাও ঘটছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উচিত এসব বিষয়ে নজরদাড়ি বাড়ানো। 

বরিশাল নৌ পুলিশের ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বরিশাল টু ঢাকা রুটের লঞ্চের মলম পার্টি, অজ্ঞান পার্টি, ছিনতাইকারীদের তৎপরতা এখনো রয়েছে। তাছাড়া লঞ্চে প্রায়ই বিছন্ন ঘটনা ঘটছে। লঞ্চ থেকে যাত্রীর নদীতে ঝাঁপ দেয়া বা খুনের মতো ঘটনা ঘটছে। তাই যাত্রাপথে লঞ্চযাত্রীদের ঝুঁকি দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। 

বরিশালের নৌ-বন্দর কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিভিন্ন সময় মিটিংএ যাত্রীদের নিরাপত্তা বিষয়ে লঞ্চ মালিকদের সাথে আলোচনা করা হয় তারপরেও লঞ্চে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে।  আমরা চেষ্টা করছি এসব দূর্ঘটনা কমিয়ে আনতে।’

একুশে সংবাদ/এআরএম