AB Bank
ঢাকা শনিবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৪, ৩০ চৈত্র ১৪৩০

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad
ekusheysangbad QR Code
BBS Cables
Janata Bank
  1. জাতীয়
  2. রাজনীতি
  3. সারাবাংলা
  4. আন্তর্জাতিক
  5. অর্থ-বাণিজ্য
  6. খেলাধুলা
  7. বিনোদন
  8. শিক্ষা
  9. তথ্য-প্রযুক্তি
  10. অপরাধ
  11. প্রবাস
  12. রাজধানী

সড়কে ৫ লাখেরও বেশি লক্কর—ঝক্কর বাস দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রাস্তা


Ekushey Sangbad
হাসান কাজল
০৯:২১ পিএম, ৩০ মার্চ, ২০২৪
সড়কে ৫ লাখেরও বেশি লক্কর—ঝক্কর বাস দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রাস্তা

  • মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিনের বিষাক্ত ধোঁয়ায় পরিবেশ দূষণের শিকার হচ্ছে রাজধানী শহর
  • প্রতিদিন কর্মজীবী মানুষদের অমানবিক কষ্ট নির্যাতন সহ্য করে পথ চলতে হচ্ছে
  • একটি চক্র পুরানো গাড়ি রং করে সড়কে নামানোর পায়তারা চালাচ্ছে
     

ঢাকা সহ সারা দেশে ৫ লাখের বেশি ভাঙ্গাচোরা লক্কর—ঝক্কর গাড়ি নিয়ে পরিবহন সেবা মুখ থুবড়ে পড়েছে। প্রতিদিন কর্মজীবী মানুষদের অমানবিক কষ্ট নির্যাতন সহ্য করে পথ চলতে হচ্ছে। মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিনের বিষাক্ত ধোঁয়ায় পরিবেশ দূষণের শিকার হচ্ছে রাজধানী শহর। সড়কে বাণিজ্যিকভাবে চলাচলকারী প্রত্যেকটি বাসের জন্য ৩ ধরণের সনদ ও নিবন্ধন বাধ্যতামূলক থাকলেও অধিকাংশ বাসের ফিটনেস নেই। সংশ্লিষ্ট একজনের মন্তব্য, ফিটনেস অনুপযোগী গাড়ির বেলায় অনেক ক্ষেত্রে রহস্যজনক কারণে ফিটনেস দিয়ে দেয় বিআরটিএ।

অনিয়ম ও দুর্নীতি সড়কে অরাজকতা বাড়তে সহযোগিতা করে যাচ্ছে বলে মনে করেন অভিজ্ঞ মহল। এতে করে সরকারের নেয়া প্রকল্পের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ যাত্রীগণ। সড়কে অসহনীয় পরিবেশ তৈরিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ—র ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন বিশিষ্টজনেরা। জানা গেছে, সড়কে বিপুল পরিমাণ ফিটনেস বিহীন গাড়ি চলমান থাকার পরও ঈদকে সামনে রেখে একটি চক্র নতুন করে পুরানো গাড়ি রং করে সড়কে নামানোর পায়তারা চালাচ্ছে। একটি বিশেষ সূত্রে প্রকাশ, নতুন পুরান এসব অবৈধ পরিবহন মোটা অংকের চাঁদা ও ঘুষ দিয়ে তাদের আধিপত্য বজায় রাখছে। ২০ থেকে ২৫ বছর আগে ঢাকা থেকে বিতাড়িত হওয়া হাজার হাজার গাড়ি ঢাকায় ফিরে আসায় পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। রাজধানীর আকাশে সীসার পরিমাণও বাড়ছে।

২০০৪ সালে ঢাকার জন্য করা ২০ বছরের পরিবহন পরিকল্পনায় ‘বাস রুট রেশনালাইজেশন’ বা ‘বাস রুট ফ্রাঞ্চাইজ’ চালু করার পরামর্শ দেওয়া হয়। বিশেষ এ ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল ঢাকার সড়ক থেকে লক্কর—ঝক্কর বাস তুলে নেওয়া। সহজ শর্তের ঋণে নতুন বাস নামানো। বাস চলবে পাঁচ—ছয়টি কোম্পানির অধীন। মালিকরা বিনিয়োগের হার অনুসারে লভ্যাংশ পাবেন। বেসরকারি বাসমালিকরা প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তাদের বাস কিনে নিতে। তা আর হয়ে ওঠেনি। ফলে উদ্যোগটি ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। যে একটি বেসরকারি কোম্পানি বাস নামিয়েছিল, তারাও লোকসানের ভারে সরে যায়। ঈদকে সামনে রেখে বিভিন্ন কোম্পানি সহ ব্যক্তিমালিকানাধীন পুরাতন ভাঙ্গাচোরা প্রচুর গাড়ি নতুন করা হচ্ছে। দেওয়া হচ্ছে রং—তুলির আঁচড়। আবার কোথাও পুরোনো ইঞ্জিন ও চেসিসের ওপর নতুন বডি বসানোর কাজ করা হচ্ছে।

এদিকে বাস মালিকরা বলছে, বাস মালিকদের সবারই লক্ষ্য ঈদের যাত্রী বহন করা। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে রাজধানীর আশেপাশের এলাকার ওয়ার্কশপগুলোতে দিন—রাত চলছে এসব কার্যক্রম। ব্যস্ত সময় পার করছেন ওয়ার্কশপের কারিগর ও রং মিস্ত্রিরা।

একাধিক বাস মালিক বলছেন, ঈদে যাত্রী বহনে অনেক নামি—দামি কোম্পানিগুলো তাদের বাস মেরামত ও রং করে দৃষ্টিনন্দন করে। এটি তাদের রুটিন কাজ। পাশাপাশি ঈদযাত্রায় দূরপাল্লার রুটের বাসের সংকট দেখা দেয়। ওই সংকটের সুযোগ নেয় অনেক বাস মালিক ও শ্রমিকেরা। লক্কর—ঝক্কর বাসে রং করিয়ে যাত্রী আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। রং লাগানো এসব গাড়ি অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায় আবার কখনও কখনও বিকল হয়। এতে তৈরি হয় যানজট। ভোগান্তির শিকার হয় যাত্রীরা।

রাজধানীর গুলিস্তান, পুরান ঢাকা, মিরপুর, পল্লবী, গাবতলী, আমিনবাজার, হেমায়েতপুর, ডেমরা, কাজলা, সায়েদাবাদ ও টাঙ্গাইল বাস টারমিনাল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে ওয়ার্কশপে চলছে বাস মেরামতের কাজ।

এদিকে টাঙ্গাইল বাস টারমিনাল এলাকায় একটি ওয়ার্কশপে দেখা গেছে, টাঙ্গাইল সেবা পরিবহণ নামক কোম্পানির দুটি বাস মেরামত করা হচ্ছে। এ দুটি বাসের পুরোনো চেসিসের ওপর নতুন করে বডি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। চলছে শেষ সময়ের রংয়ের কাজ।গাবতলীর একটি ওয়ার্কশপে ডিপজল পরিবহণের বাসের ভাঙা অংশ কেটে ফেলা হচ্ছে। সেখানে নতুন ইস্পাত লাগিয়ে মেরামত করা হচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন ওয়ার্কশপের ব্যস্ত সময় পার করছে কারিগররা।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটি এ মনে করেন, দেশে বর্তমানে ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের সংখ্যা ৫ লাখের বেশি। প্রকৃত অর্থে তার সংখ্যা আরও বেশি। এসব যানবাহনের মধ্যে ৭০ শতাংশ রাস্তায় চলাচল করছে, যা দেশের পরিবহন ব্যবস্থার নিরাপত্তায় বড় সংকট তৈরি করছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ।

এবিষয়ে কথা হয় এক যাত্রীর সঙ্গে। প্রতিদিনের চলার পথের বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সড়কে চলা গাড়ির মধ্যে ৮০ ভাগের বেশি ফিটনেস বিহীন। গাড়ির সিট কভার নেই। বিপদজনকভাবে লোহা ভেঙে বিরিয়ে থাকে যা থেকে মানুষের হাত, পা সহ শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে যায়। সিটে বসার সাথে সাথে ধুলোর ঝড় এসে নাকে—মুখে, শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। বেশির ভাগ গাড়ির জানালার কাচঁ ভাঙ্গা কিংবা কাচঁ নেই। বৃষ্টি এলে ভিজতে হয়, রোদে পুড়ে চলতে হয়। সড়কে চলতে গিয়ে মাঝপথে ইঞ্জিন বিকল হয়। বিরম্ভনায় পড়তে হয় মহিলা, রোগী সহ বৃদ্ধ অসহায় মানুষদের। তারপর সিট বসানো হয় যা বসার অনুপযোগী। অনেক গাড়ির সিটে ছিঁড়া কাঁথা বেঁধে রাখা সহ ভাঙ্গা গাড়ির এক অংশের সাথে অন্য অংশকে রশি দিয়ে বেঁধে রাখতে দেখা যায়।

বিআরটিএ বলেন, ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ ৫ লাখ যানবাহনের মধ্যে ৩০ শতাংশ রাস্তায় চলাচল করে না। বাকি ৭০ শতাংশ দেশের পরিবহনব্যবস্থার নিরাপত্তায় বড় সংকট তৈরি করছে। তারা ফিটনেসবিহীন যানবাহন রাস্তায় পেলে জব্দ করে ডাম্পিংয়ে পাঠাচ্ছেন বলে জানায়।

প্রতিদিন দেশে সড়কে মানুষ মারা যায় বলে মন্তব্য করে একজন কর্মকর্তা বলেন, এখানে আমরাও নিরাপদ নই। আমাদেরকে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং তা করতে হলে আমাদের সবাইকে ট্রাফিক আইন মেনে চলা জরুরি। পরিবহন মালিক থেকে শ্রমিক ও সড়ক ব্যবহারকারী সকলকে সচেতন হয়ে, ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলতে হবে। এছাড়া সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। ঢাকা সড়ক পরিবহন কতৃপক্ষের মতে, শুধু রাজধানীর সড়কে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হলে ১০০ ম্যাজিস্ট্রেটের প্রয়োজন। তবে তাঁদের অধীনে আছেন মাত্র পাঁচ—ছয়জন ম্যাজিস্ট্রেট। তাই সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারলে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের এক গবেষণায় যেসব তথ্য উঠে এসেছে তার মধ্যে অন্যতম তথ্য হলো,  দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস ও মিনিবাস থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। এই চাঁদার ভাগ পায় দলীয় পরিচয়ধারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা—কর্মচারী, মালিক—শ্রমিক সংগঠন ও পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধিরা।

গবেষণা প্রতিবেদনে  আরও বলা হয়, ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ সিটি সার্ভিস শ্রমিকদের মতে তাদের বাস সার্ভিস অতিরিক্ত ভাড়া নেয়। ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ আন্তঃজেলা বাস শ্রমিকদের মতে তাদের বাস অতিরিক্ত ভাড়া নেয়। ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ শ্রমিক বলছে, তাদের কোম্পানি ভাড়ার বিপরীতে কোনো টিকেট দেয় না। ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ আন্তঃজেলা বাস কোম্পানিতে টিকিট বাতিল ও মূল্য ফেরতের কোনো নীতিমালা নেই।

প্রতিবেদনে আরও উঠে এসছে, সিটি সার্ভিসের ৮৯ দশমিক ২ শতাংশ শ্রমিকদের মতে তাদের কোম্পানির বাস নিয়ম অনুযায়ী, বাসের টায়ার, ইঞ্জিন ওয়েল, ব্রেক সংক্রান্ত সরঞ্জামাদি পরিবর্তন ও রক্ষণাবেক্ষণ করে না। ৪০ দশমিক ৪ শতাংশ সিটি বাস সার্ভিসের কর্মীদের মতে তাদের বাদ নকশা পরিবর্তন করে অতিরিক্ত আসন সংযোজন করা হয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনটিতে আরও তুলে ধরা হয়, ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ নারী বাস যাত্রী যাত্রাপথে কোনো না কোনো সময়ে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন বা হতে দেখেছেন। ৮৩ দশমিক ২ শতাংশ নারী সহযাত্রী দ্বারা, ৬৪ দশমিক ৩ হেল্পার দ্বারা, ৪০ দশমিক ৬ কন্ডাক্টর দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, পরিবহন শ্রমিকদের খারাপ আচরণ বা যৌন হয়রানির শিকার হলে ৯২ দশমিক ৯ শতাংশ যাত্রী কোনো অভিযোগ করেননি। ৫২ দশমিক ৯ শতাংশ যাত্রী বলছেন, অভিযোগ জানানোর কোনো ব্যবস্থা নেই।


একুশে সংবাদ/ন.প্র/জাহা

 

 

Link copied!