মানুষের সুস্থতা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সঙ্গে ঘুমের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম শুধু ইবাদত-বন্দেগির বিধানেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ঘুম, খাদ্যাভ্যাস, চলাফেরা ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতাসহ দৈনন্দিন জীবনের নানা বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছে।
ঘুমানোর ক্ষেত্রেও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এমন কিছু সুন্নাহ শিক্ষা দিয়েছেন, যা একদিকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উপায়, অন্যদিকে একজন মুমিনের আদর্শ জীবনাচরণের অংশ। ইসলামে উপুড় হয়ে ঘুমানো নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এর পরিবর্তে ডান কাত হয়ে ঘুমানোর প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে, যা সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত।
কুরআনের দিকনির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا
‘রাসুল তোমাদের যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং তিনি যা থেকে তোমাদের নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাকো।’ (সুরা আল-হাশর: আয়াত ৭)
এই আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশনা মেনে চলাই একজন মুমিনের কর্তব্য। তাই ঘুমানোর আদব সম্পর্কেও তার শিক্ষা গুরুত্বের সঙ্গে অনুসরণ করা উচিত।
কেন উপুড় হয়ে ঘুমানোকে নিরুৎসাহিত করেছেন নবীজি (সা.)?
আমাদের মধ্যে অনেকের উপুড় হয়ে ঘুমানোর অভ্যাস রয়েছে। ইসলামী শরিয়তে এটি সরাসরি হারাম বা কবিরা গুনাহ নয়; তবে অধিকাংশ আলেমের মতে এটি মাকরুহ তানযিহি (অপছন্দনীয়) আমল। বিভিন্ন হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) উপুড় হয়ে শোয়াকে নিরুৎসাহিত করেছেন। হাদিসগুলো থেকে এর প্রধান দুটি কারণ জানা যায়—
প্রথমত— মহান আল্লাহ তাআলা এভাবে শোয়াকে পছন্দ করেন না।
দ্বিতীয়ত— এটিকে জাহান্নামবাসীদের শোয়ার ভঙ্গি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আল্লাহ এই ভঙ্গি পছন্দ করেন না
ইবনে তিখফা আল-গিফারি (রহ.) তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন—
এক রাতে তিনি মসজিদে উপুড় হয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন। এমন সময় একজন এসে তাকে পা দিয়ে নাড়া দিয়ে বললেন—
قُمْ فَإِنَّهَا ضِجْعَةٌ يُبْغِضُهَا اللَّهُ
‘উঠে পড়ো। নিশ্চয়ই এটি এমন শোয়ার ভঙ্গি, যা আল্লাহ অপছন্দ করেন।’
তিনি মাথা তুলে দেখলেন, তিনি ছিলেন স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.)। (আল-আদাবুল মুফরাদ ১১৯৯)
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত— রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তিকে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে বলেন—
إِنَّ هَذِهِ ضِجْعَةٌ لَا يُحِبُّهَا اللَّهُ
‘নিশ্চয়ই এ ধরনের শোয়া আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন না।’ (তিরমিজি ২৭৬৮)
এটি জাহান্নামিদের শোয়ার ভঙ্গি
হজরত আবু জর আল-গিফারি (রা.) বলেন, আমি উপুড় হয়ে শুয়ে ছিলাম। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে পা দিয়ে স্পর্শ করে বললেন—
يَا جُنَيْدِبُ، إِنَّمَا هَذِهِ ضِجْعَةُ أَهْلِ النَّارِ
‘হে জুনাইদিব! এটি তো জাহান্নামবাসীদের শোয়ার ভঙ্গি।’ (ইবনে মাজাহ ৩৭২৪)
বিশেষ পরিস্থিতিতে বিধান
তবে ইসলাম সহজতার ধর্ম। যদি কোনো ব্যক্তি গুরুতর অসুস্থ হন, পিঠ বা কোমরে আঘাতের কারণে ডান বা বাম কাত হয়ে শুতে না পারেন, কিংবা বিশেষ কোনো শারীরিক সমস্যার জন্য চিকিৎসক উপুড় হয়ে শোয়ার পরামর্শ দেন— তাহলে চিকিৎসার প্রয়োজন বা নিরুপায় অবস্থায় উপুড় হয়ে শোয়াতে কোনো গুনাহ নেই। কারণ শরিয়তে প্রয়োজন ও অক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
ইসলাম মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে সুন্দর, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও কল্যাণময় করতে চায়। ঘুমানোর ভঙ্গিও তার ব্যতিক্রম নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ডান কাত হয়ে ঘুমাতে উৎসাহ দিয়েছেন এবং উপুড় হয়ে শোয়াকে নিরুৎসাহিত করেছেন।
তাই একজন মুসলিমের উচিত সুন্নাহ অনুযায়ী ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তোলা এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে উপুড় হয়ে না শোয়া। তবে অসুস্থতা বা চিকিৎসাগত প্রয়োজনে শরিয়ত যে সহজতা দিয়েছে, সেটিও মনে রাখা জরুরি। আল্লাহ তাআলা আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রিয় নবী (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

