আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন উপলক্ষে আয়োজিত গণভোটকে সামনে রেখে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় উচ্চপর্যায়ের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রস্তুতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সমন্বয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সরকারের দায়িত্ব হলো নির্বাচন কমিশনকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেওয়া। এটি জাতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং এই নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারলে তা দেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হবে। তিনি বলেন, “১২ ফেব্রুয়ারি যেন কোথাও কোনো ঘাটতি না থাকে—এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য। এবারের নির্বাচন এমন হওয়া দরকার, যা ভবিষ্যতের জন্য আদর্শ হয়ে থাকবে।”
ড. ইউনূস বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রস্তুতির ধাপভিত্তিক পরীক্ষা শুরু হয়েছে। আজ থেকেই সেই প্রক্রিয়া শুরু হলো, যার চূড়ান্ত পরিণতি হবে ভোটের দিন। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনাই এখন সর্বোচ্চ নির্দেশ হিসেবে গণ্য হবে এবং সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নেতৃত্বমূলক ভূমিকা পালন করবে। প্রচলিত চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত ঝুঁকিও যুক্ত হয়েছে, যা সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।
প্রধান উপদেষ্টা জানান, এবারের নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ভোটকেন্দ্রে বডি ক্যামেরা ও সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম থেকে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। তিনি বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
ড. ইউনূস বলেন, এবারের নির্বাচন দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষকদের ব্যাপক নজর কাড়ছে। বিষয়টি তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে, ফলে আমাদেরও দায়িত্বশীল ও সতর্ক থাকতে হবে। বর্তমান প্রস্তুতি ও পরিস্থিতি বিবেচনায় একটি সুন্দর নির্বাচন সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বৈঠকে নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ জানান, নিবন্ধিত ৫৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য ২৬টি দেশের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বড় একটি পর্যবেক্ষক দল বাংলাদেশে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে তাদের কয়েকজন প্রতিনিধি মনোনয়নপত্র আপিল প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছেন।
তিনি আরও জানান, বুধবার মধ্যরাত থেকে শুরু করে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যাবে। তবে সাইবার স্পেসে অপতথ্য ও গুজব ছড়ানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। দলীয় প্রতীক, গণভোট ও পোস্টাল ব্যালট গণনায় সময় বেশি লাগতে পারে—এ বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়াতে গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানান, নির্বাচনের দিন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, ভোটের দিন সব কেন্দ্রে মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সংযোগ নির্বিঘ্ন রাখতে কাজ চলছে।
সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান জানান, ২০২৪ সালের আগস্টে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে। লুট হওয়া অস্ত্রের প্রায় ৬২ শতাংশ এবং গোলাবারুদের অর্ধেকের বেশি পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, নির্বাচনকালে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাহিনীগুলো সমন্বিতভাবে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, যা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ জানান, প্রিজাইডিং অফিসারের নিরাপত্তায় সশস্ত্র আনসার সদস্যরা ভোটকেন্দ্রের ভেতরে দায়িত্ব পালন করবেন। এতে কেন্দ্রের ভেতরে কোনো ধরনের বেআইনি কার্যক্রম রোধ করা সহজ হবে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, এবারের নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অংশ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং প্রয়োজনে ভোটকেন্দ্র প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে পারবেন।
স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গণি জানান, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই বডি ক্যামেরা মাঠপর্যায়ে পৌঁছে যাবে। ভোটের চার দিন আগে সব বাহিনী মোতায়েন করা হবে এবং ভোটের পরও আরও সাত দিন তারা দায়িত্বে থাকবে। ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও থাকবে।
তিনি বলেন, আজ থেকেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একাধিক টিম সার্বক্ষণিকভাবে নির্বাচনসংক্রান্ত তথ্য মনিটরিং ও নথিভুক্ত করবে। বডি ক্যামেরার মাধ্যমে ঘটনাস্থলের সঙ্গে তাৎক্ষণিক সংযোগ স্থাপন সম্ভব হবে।
বৈঠকের শেষে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বডি ক্যামেরা ব্যবহারের সম্ভাবনা ব্যাপক। এটি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। প্রয়োজনে প্রতি সপ্তাহে বা আরও ঘন ঘন এ ধরনের সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হবে বলেও তিনি জানান।
একুশে সংবাদ/ এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

