ভয়াবহ শীতকালীন ঝড়ের কবলে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। নিউ মেক্সিকো থেকে নিউ ইংল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তুষারপাত, বরফ ও হিমশীতল বাতাসের কারণে বিমান চলাচল ব্যাহত হয়েছে, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়েছে লাখো মানুষের এবং অন্তত এক ডজন অঙ্গরাজ্যে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।
স্থানীয় সময় শনিবার (২৪ জানুয়ারি) থেকে শুরু হওয়া এই ঝড়ের ফলে শনিবার ও রোববার মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রায় ১৩ হাজার ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। ফ্লাইট ট্র্যাকিং সংস্থা ফ্লাইটঅ্যাওয়ারের তথ্যমতে, সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান বিমানবন্দরগুলো।
বার্তাসংস্থা এপির তথ্য অনুযায়ী, নিউ মেক্সিকো থেকে নিউ ইংল্যান্ড পর্যন্ত প্রায় ১৪ কোটি মানুষ— যা দেশটির মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশেরও বেশি— শীতকালীন ঝড়ের সতর্কতার আওতায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস জানিয়েছে, দক্ষিণ রকি পর্বতমালা থেকে শুরু করে উত্তর-পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত ভারী তুষারপাত, বরফবৃষ্টি ও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।
সংস্থাটির আবহাওয়াবিদ অ্যালিসন স্যান্টোরেলি বলেন, তীব্র ঠান্ডার কারণে তুষার ও বরফ ধীরে গলবে, ফলে উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে অন্তত এক ডজন অঙ্গরাজ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণার অনুমোদন দিয়েছেন। মার্কিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টি নোয়েম জানিয়েছেন, ফেডারেল ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি (ফেমা) আগাম প্রস্তুতি হিসেবে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে উদ্ধারকারী দল, সরঞ্জাম ও ত্রাণসামগ্রী মোতায়েন করেছে। তিনি জনগণকে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার আহ্বান জানান।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শনিবার পর্যন্ত অন্তত এক লাখ ২০ হাজার বাড়িঘর বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। টেক্সাস ও লুইজিয়ানায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। টেক্সাসের শেলবি কাউন্টিতে বরফের ভারে গাছ ভেঙে বিদ্যুৎ লাইন ছিঁড়ে যাওয়ায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বাসিন্দা অন্ধকারে পড়েন।
শেলবি কাউন্টির কমিশনার স্টিভি স্মিথ জানান, শত শত গাছ উপড়ে পড়েছে এবং রাস্তা পরিষ্কার করতে হিমশিম খাচ্ছে উদ্ধারকারী দল। একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছে লুইজিয়ানার ডেসোটো প্যারিশ প্রশাসনও।
বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে ওকলাহোমা সিটির উইল রজার্স আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, যেখানে শনিবার সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়। ডালাস–ফোর্ট ওর্থ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৭০০টির বেশি ফ্লাইট ছাড়েনি। শিকাগো, আটলান্টা, ন্যাশভিল, শার্লট এবং ওয়াশিংটনের রোনাল্ড রিগ্যান জাতীয় বিমানবন্দরেও ব্যাপক ফ্লাইট বাতিলের ঘটনা ঘটেছে।
নিউ জার্সির গভর্নর মিকি শেরিল বলেন, দেশটি বহু বছর পর এমন ভয়াবহ শীতকালীন ঝড়ের মুখোমুখি হয়েছে। তিনি ভারী যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং মহাসড়কে সর্বোচ্চ গতি সীমা নির্ধারণের ঘোষণা দেন।
আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, কিছু এলাকায় বরফ জমে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা হারিকেনের মতো ভয়াবহ হতে পারে। মিডওয়েস্ট অঞ্চলে অনুভূত তাপমাত্রা মাইনাস ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত নেমে গেছে, যা কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফ্রস্টবাইটের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। উইসকনসিনের রাইনল্যান্ডারে প্রায় ৩০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।
শিক্ষা কার্যক্রমেও প্রভাব পড়েছে। ফিলাডেলফিয়া ও হিউস্টনে সোমবার স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। নর্থ ক্যারোলাইনা ও মিসিসিপির একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ও ক্লাস বাতিল করেছে।
আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, ঝড়টি দক্ষিণাঞ্চল অতিক্রম করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক ও বোস্টন এলাকায় ৩০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত তুষারপাত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

