কয়েকদিনের তীব্র সংঘর্ষের পর কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ)-এর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি ঘোষণা করেছে সিরিয়া সরকার। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, এই চুক্তির আওতায় ইউফ্রেটিস নদীর পশ্চিমাঞ্চল থেকে এসডিএফ তাদের বাহিনী প্রত্যাহার করবে এবং যোদ্ধাদের ধাপে ধাপে সিরিয়ার জাতীয় সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
আল জাজিরার তথ্যমতে, স্থানীয় সময় রোববার হওয়া এই সমঝোতা অনুযায়ী এসডিএফ নিয়ন্ত্রিত আল-হাসাকা, দেইর আজ-জোর ও রাক্কা—এই তিনটি পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম পুনরায় শুরু হবে।
দামেস্কে দেওয়া বক্তব্যে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা বলেন, চুক্তির শর্ত বাস্তবায়নে সহযোগিতা করতে দেশের আরব গোত্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে। তিনি সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান।
চুক্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, আইএসআইএল (আইএস) সংশ্লিষ্ট বন্দি ও শিবিরগুলো পরিচালনায় যুক্ত এসডিএফের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কাঠামো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সঙ্গে একীভূত করা হবে। এর ফলে এসব বন্দি ও শিবিরের আইনি ও নিরাপত্তা দায়িত্ব সরাসরি সরকারের হাতে ন্যস্ত হবে।
এ ছাড়া এসডিএফ কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন সামরিক, নিরাপত্তা ও বেসামরিক গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের জন্য একটি প্রস্তাবিত নামের তালিকা দেবে, যাতে জাতীয় অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা যায়।
সিরিয়ায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত টম ব্যারাকের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট আল-শারার বৈঠকের পর যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। এসডিএফ প্রধান মাজলুম আবদি বৈঠকে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তাঁর সফর একদিন পিছিয়ে সোমবারে নির্ধারিত হয়েছে। কুর্দি সংবাদমাধ্যম রুদাও জানিয়েছে, তিনি ইতোমধ্যে দেইর আজ-জোর ও রাক্কা থেকে বাহিনী প্রত্যাহারে সম্মত হয়েছেন।
যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে মার্কিন বিশেষ দূত টম ব্যারাক একে ‘একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট আল-শারা নিশ্চিত করেছেন যে কুর্দিরা সিরিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং আইএসবিরোধী লড়াইয়ে যুক্ত ঐতিহাসিক অংশীদারদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত হওয়াকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে।
এদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ফোনে আল-শারার সঙ্গে কথা বলে দামেস্কের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে এসডিএফকে নিষিদ্ধ ঘোষিত কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে)-এর সহযোগী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে।
আল জাজিরার দামেস্ক প্রতিনিধি আইমান ওঘান্না জানিয়েছেন, এই যুদ্ধবিরতিকে কেন্দ্রীয় সরকার ও তার মিত্র তুরস্কের জন্য বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। চুক্তির ফলে রাক্কা, আল-হাসাকা ও দেইর আজ-জোর পুরোপুরি কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং বেসামরিক প্রশাসনও দামেস্কের হাতে ফিরে যাবে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, সীমান্ত ক্রসিং, তেল ও গ্যাসক্ষেত্রসহ সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিয়ন্ত্রণও এই চুক্তির মাধ্যমে সরকারের হাতে ন্যস্ত হবে।
এর আগে মার্চে এসডিএফকে সেনাবাহিনীতে একীভূত করার বিষয়ে একটি চুক্তি হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়, যা চলতি মাসে আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
শনিবার সিরীয় সেনাবাহিনী এসডিএফ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অগ্রযাত্রা চালিয়ে তাবকা শহর ও বাঁধ, রাক্কার পশ্চিমের ফ্রিডম বাঁধ এবং দেইর আজ-জোরের আল-ওমর তেলক্ষেত্র ও কনোকো গ্যাসক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট আল-শারা বলেছিলেন, দেশের এক-চতুর্থাংশ ভূখণ্ড ও প্রধান তেল-গ্যাস সম্পদের নিয়ন্ত্রণ এসডিএফের হাতে থাকা ‘গ্রহণযোগ্য নয়’।
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জামাল মানসুর আল জাজিরাকে বলেন, রাজনৈতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়া, স্থানীয় আরব গোত্রগুলোর সমর্থন হ্রাস এবং কুর্দি আধিপত্যের অভিযোগ এসডিএফকে দ্রুত পিছু হটতে বাধ্য করেছে।
চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় দেশটির বাইরে থেকে আসা পিকেকে সংশ্লিষ্ট সব নেতাকর্মীকে সংশ্লিষ্ট এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে।
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

