AB Bank
ঢাকা রবিবার, ২৬ মে, ২০২৪, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad
ekusheysangbad QR Code
BBS Cables
Janata Bank
  1. জাতীয়
  2. রাজনীতি
  3. সারাবাংলা
  4. আন্তর্জাতিক
  5. অর্থ-বাণিজ্য
  6. খেলাধুলা
  7. বিনোদন
  8. শিক্ষা
  9. তথ্য-প্রযুক্তি
  10. অপরাধ
  11. প্রবাস
  12. রাজধানী

ফুটপাতের শরবত কতটা নিরাপদ!


Ekushey Sangbad
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
০৫:১১ পিএম, ১৯ এপ্রিল, ২০২৪
ফুটপাতের শরবত কতটা নিরাপদ!

ফুটপাতে বিক্রি হওয়া নানা রংয়ের পানীয়তে তৃষ্ণা মিটলেও স্বাস্থ্যের জন্য তা অনিরাপদ (ছবি: একুশে সংবাদ)

গত ক’দিন ধরে চলছে প্রচণ্ড দাবদাহ। গ্রীষ্মের দাবদাহ আর ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ মানুষ। তীব্র গরমে একটু শীতলতা খুঁজে বেরাচ্ছে নগরবাসী। এই গরমে কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে ওঠা শ্রমজীবীরা প্রাণ জুড়াতে ফুটপাতের পাশে থাকা আখের দোকানের সামনে, আবার কেউ শরবতের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে রস বা লেবুর শরবত খাওয়ার জন্য। প্রশ্ন থেকে যায়, পথের ধারের এসব পানীয় কতটা নিরাপদ? কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন নগরীর স্বল্প আয়ের এই মানুষগুলো যারা জেনে বা না জেনে কিংবা সাধ্য অনুযায়ী রাস্তার পাশের  এসব পানীয়গুলো পান করছেন?

বৃহস্পতিবার (১৮ এপ্রিল) রাজধানীর গুলিস্তান, পল্টন ও স্টেডিয়াম এলাকা ঘুরে দেখা যায়, রাস্তার পাশে বিভিন্ন রং-বেরঙের ও ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের শরবত বিক্রি হচ্ছে পুরোদমে। তাপমাত্রা যত বাড়ছে ততোই বাড়ছে এসব দোকানে মানুষের ভিড়। শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক সবাই পান করছে রাস্তার পাশের শরবত। এসময় কথা হয় ক্রেতা বিক্রেতা উভয়ের সঙ্গেই।

এসব দোকানে লেবুর শরবত প্রতি গ্লাস ১০ টাকা, প্যাকেটজাত ফ্লেভার দিয়ে বানানো ৫০০ মিলি লিটার বোতলের শরবত ২০ টাকা, বেলের শরবত প্রতি গ্লাস ২০ টাকা ও তোকমাসহ বিভিন্ন ফল দিয়ে বানানো শরবত প্রতি গ্লাস ২০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে।

উন্মুক্ত স্থানে, ধুলায় আচ্ছন্ন রাস্তায় নোংরা পরিবেশে উন্মুক্তভাবে বিভিন্ন ফল সাজিয়ে রাখা হয়। এগুলো দিয়েই তৈরি হয় এসব শরবত। সাজিয়ে রাখা খোলা বেলে ধুলোময়লা যাচ্ছে, সেটা দিয়ে শরবত বানান কেন—জানতে চাইলে এক বিক্রেতা বলেন, এগুলো স্যাম্পল। এগুলো দিয়ে শরবত তৈরি করি না। কিছুক্ষণ পরে তাকে ওই বেল দিয়েই শরবত বানাতে দেখা যায়। আবার প্রশ্ন করলে তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেননি।

রাস্তার পাশে রিকশা থামিয়ে শরবত পান করছিলেন চালক মো. হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, সারাদিন রোদের মধ্যে ঘুরতে হয়। কত আর সহ্য করা যায়। তাই কোথাও থামলে এক গ্লাস লেবুর শরবত খাই, এটা কিছুটা শান্তি দেয়। এই লেবুর শরবত পরিষ্কার পানিতে বানানো হচ্ছে কিনা যাচাই করেছেন কখনও—এই প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, হ্যাঁ, এগুলো পরিষ্কার পানি দিয়েইতো বানায়। দোকানদারতো তাই বলেছে।

শরবত বিক্রেতা শরিফুলের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন ঢাকা শহরে আবার অপরিষ্কার পানি আছে নাকি?  সবই পরিষ্কার পানি। আমি শরবত বানাই ফিল্টারের পানি দিয়ে। যারা পানি (বড় জার) বিক্রি করে তারা আমাকে পানি দিয়ে যায়।

ঈদের ছুটি কাটিয়ে রাজধানীতে ফিরেছেন দুই কর্মজীবী বন্ধু শফিক ও রানা। গুলিস্তানে বাস থেকে নেমে রাস্তার পাশের দোকান থেকে শরবত খাচ্ছিলেন তারা। তারা বলেন, আড়াই ঘণ্টা বাসে ছিলাম। গরমে অস্থির হয়ে গেছি। তাই ঠান্ডা শরবত খেলাম। পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে তারা বলেন, কত কিছুই তো খেয়ে ফেলছি আমরা; এটায় আর কী হবে!

হিমু আকতার নামের এক পথচারী তার স্বামী রনিকে নিয়ে বেলের শরবত খাচ্ছিলেন। তাদের দেখা যায় অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে তৈরি শরবত খেতে। হিমু আকতার বলেন, এই পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম। গরম লেগেছে তাই স্বামীকে নিয়ে একটু শরবত খেলাম। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে এই শরবত তৈরি হচ্ছে। এটা আপনাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এমনটা তাকে বললে তিনি বলেন, জি আমি এটা জানি। আর খাবো না।

যে ক‘জন শরবত বিক্রেতার সঙ্গে আলাপ হয়, তাদের কাছে পানি ও বরফ কতটা নিরাপদ এই বিষয়ে জানতে চাইলে তারা নিজেদের পক্ষেই কথা বলেন।

শরবত তৈরির পানি ও বরফ কোথা থেকে আনেন জানতে চাইলে এক বিক্রেতা বলেন, আমি ওয়াসার পানি ফিল্টার থেকে কার্ড দিয়ে পানি আনি। আমার পানি পরিষ্কার। বরফ আনি স্টেডিয়াম মার্কেটের একটা দোকান থেকে সেটাও ভালো বরফ।

আরেক বিক্রেতা জানান, আমি ফিল্টারের পানি ব্যবহার করি। এখানের মার্কেটে যারা পানি দিয়ে যায় তারা আমাকেও পানি দিয়ে যায়। বরফ কোথা আনেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি বরফ আনি কাপ্তানবাজার থেকে।

বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলার পর তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী খোঁজ নেওয়া হয় স্টেডিয়াম মার্কেটের বরফের দোকানে। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম সুইমিংপুল মার্কেটের মতিউর রহমান বরফ ডিপোর বিক্রেতা মো. হারুন বলেন, আমি মূলত বরফ রাখি খেলোয়াড়দের জন্য। তারা ব্যাথা পেলে বরফের দরকার পড়ে। অনেক সময় তারা বরফ পানি দিয়ে গোসল করে তখন নেয়। এছাড়া মার্কেটের অনেক দোকানে এসির  কাজ করে। তাদেরও বরফ প্রয়োজন পড়ে। তারা আমার থেকে বরফ নেয়। এছাড়া বেশি গরম পড়লে ফ্রিজের ড্রিংকস ঠান্ডা হতে চায় না। তখন আমি এটা ব্যবহার করি। আর রাস্তার পাশের বিভিন্ন দোকানে যাদের ফ্রিজ নেই  তারা ড্রিংকস ঠান্ডা করার জন্য নেয়।

এই বরফ শরবত বিক্রেতারা শরবতের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করে। এটা কি খাওয়ার যোগ্য বরফ কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা খাওয়ার বরফ না। এটা এমনি বাইরের কাজে ব্যবহার করার বরফ। খাওয়ার বরফ আলাদা। কেউ অর্ডার করলে আমি খাওয়ার বরফ এনে দেই। আর শরবত বিক্রেতারা যদি এটা খাওয়ার বরফ হিসেবে বিক্রি করে সেটায় তো আমার কিছু করার নেই। আমি বলেই দেই যে এটা খাওয়ার বরফ না।

রাস্তার পাশে বিক্রি করা বাহারি এসব পানীয়র মান ও স্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিয়ে কথা হয় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রচণ্ড গরমে শরীর থেকে ঘাম আকারে পানি বের হয়ে যায়, ফলে তীব্র পিপাসা পায়। পথচারী বা রাস্তায় যারা কাজ করেন তারা রাস্তার পাশে বিভিন্ন ধরনের শরবত বা লেবুর শরবত বা পানীয় পান করে থাকেন। এই পানীয় গ্রহণ করার প্রথম বিপদ হচ্ছে এই শরবতগুলো যে পানি দ্বারা তৈরি করে সেগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই থাকে অনিরাপদ পানি। অর্থাৎ ওয়াসার সরবরাহ করা পানি সরাসরি গ্রহণ করে। দ্বিতীয়ত গরমের সময় এই শরবতগুলোকে ঠান্ডা করার জন্য যে বরফ দেওয়া হয় সেগুলোর সবগুলোতেই প্রায় অনিরাপদ পানি ব্যবহার করা হয়। কারণ বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে বরফ বানানোর যে কলগুলো রয়েছে সেখানে কিন্তু নিরাপদ পানি ব্যবহার করতে আমরা এখনও দেখিনি।

বিক্রেতারা ফিল্টার পানি ব্যবহার করে বলছে, সেগুলো কতটা নিরাপদ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা মিডিয়াতে প্রায় সময়ই দেখি এসব পানির ব্যবসায়ীরা সরাসরি ওয়াসার ট্যাপের পানি জারে ঢুকিয়ে ফিল্টার পানি বলে ব্যবহার করছে। তাই এগুলোর মানও প্রকৃতপক্ষে ভালো না।

পথের পাশের বিক্রি করা পানীয় স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, এই অনিরাপদ পানি বা বরফ দিয়ে বানানো শরবতগুলো খাওয়ার ফলে পানি বাহিত রোগ যেমন টাইফয়েড, জন্ডিস, হেপাটাইটিসের মতো রোগগুলো ছড়াতে থাকে। এছাড়া ফুড পয়জনিং, বমিও হতে পারে। গরমের সময় ঢাকায় কিন্তু এই অসুখগুলো বেড়ে যায়। এবারও আমরা এটাই দেখছি। এই বেড়ে যাওয়ার কারণ হচ্ছে যত্রতত্র পথের ধারের এসব শরবত বা পানীয় পান করা।

পানি বাহিত রোগমুক্ত থাকতে এবং সুস্থ থাকার পরামর্শ দিয়ে লেনিন চৌধুরী বলেন, যারা বাইরে কাজে বের হবেন তারা যেন বাসার ফুটানো পানি বা ফিল্টারের পানি সঙ্গে নিয়ে বের হন। আর যারা রিকশা চালান বা কায়িক শ্রমের কাজ করেন তারা নিরাপদ পানিতে ওরস্যালাইন দিয়ে যেন পান করেন। এতে শরীর থেকে যে লবণ বের হয়ে হয়ে যায় তার পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে এবং অসুস্থতা থেকে আমাদের রক্ষা করবে। এছাড়াও বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের তিনি এই তাপদাহে বাসার বাইরে না বের হওয়ার পরামর্শ দেন। একইসঙ্গে যারা বাইরে কাজ করেন তাদের ছাতা ব্যবহারের কথাও বলেন তিনি।

 

একুশে সংবাদ/ব.ট.প্র/জাহা   
 

Link copied!