AB Bank
  • ঢাকা
  • বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬,

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad QR Code
BBS Cables
Janata Bank
  1. জাতীয়
  2. রাজনীতি
  3. সারাবাংলা
  4. আন্তর্জাতিক
  5. অর্থ-বাণিজ্য
  6. খেলাধুলা
  7. বিনোদন
  8. শিক্ষা
  9. তথ্য-প্রযুক্তি
  10. অপরাধ
  11. প্রবাস
  12. রাজধানী

আলোহীন জীবনে ১১ সদস্যের বাঁচার লড়াই



আলোহীন জীবনে ১১ সদস্যের বাঁচার লড়াই

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার ৭ নম্বর কামারচক ইউনিয়নের দক্ষিণ ইসলামপুর গ্রামে একই পরিবারে তিন প্রজন্মের ১১ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ভাঙা ও জরাজীর্ণ ঘরে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বৃষ্টিতে পোহাতে হয় অসনীয় ভোগান্তি।

ঘরের চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে এবং বর্ষা এলেই হাওরের পানিতে তলিয়ে যায় তাদের বসতভিটা। নেই পর্যাপ্ত খাবার। শরীরে চিকিৎসার করানোর নেই প্রয়োজনীয় অর্থকড়িও। অভাব-অনটন যেন এই পরিবারের নিত্যসঙ্গী। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বন্যার দুর্ভোগ। গত কযেকদিন আগে মনু নদীর বাঁধ ভেঙে তাদের বসতবাড়ি তলিয়ে যায়। চরম দারিদ্র্য, নদীভাঙন এবং বন্যার দুর্ভোগ সব মিলিয়ে দুঃখকষ্টে দিন কাটছে তাদের।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, করাইয়া হাওরপাড়ে জরাজীর্ণ একটি বাড়িতে বসবাস করেন সহোদর দুই ভাই কামাল মিয়া মুন্সি ও লাফুল মিয়া মুন্সি। তাদের দুই পরিবারের ১১ সদস্যই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ পরিবারের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতার ইতিহাস তিন প্রজন্মজুড়ে। দুই ভাইয়ের দাদা ছিলেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তাদের বাবা শৈশবে চোখে দেখলেও ১০-১১ বছর বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারান। এরপর জন্ম  থেকেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হন দুই ভাই। বর্তমানে তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিরাও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী।

৮০ বছর বয়সী কামাল মিয়া মুন্সির পরিবারে রয়েছেন ছেলে জগলু মিয়া (২৭), ফখরুল মিয়া (২৬), মেয়ে সুফি বেগম (৩৮), নাতি সোহান মিয়া (১৫), নাতনি শারমিন বেগম (১৫) ও ফাইজা বেগম (৬)। তারা সবাই জন্মগত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। এর মধ্যে সোহান বাকপ্রতিবন্ধি এবং  শারমিন মানসিক প্রতিবন্ধিতারও শিকার।

অন্যদিকে ৭০ বছর বয়সী লাফুল মিয়া মুন্সির পরিবারে তিনি নিজে ছাড়াও ছেলে সারজক মিয়া (২৮), নাতি আকবর আলী (৬) ও নাতনি আনিকা আক্তার (২) দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। উপার্জনক্ষম ব্যক্তিরা দৃষ্টিহীন হওয়ায় পরিবারটিতে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র অভাব-অনটন। তিন বেলা ঠিকমতো খাবার জোটানোই এখন তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিবারের সদস্যরা জানান, বিভিন্ন সময় স্থানীয়ভাবে চিকিৎসার চেষ্টা করা হলেও চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন তাদের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। অর্থাভাবে বর্তমানে চিকিৎসাও বন্ধ হয়ে গেছে। দৃষ্টিশক্তি না থাকায় তারা কোনো কাজ করতে পারেন না, আবার শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে কেউ কাজের সুযোগও দেন না। ফলে অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভর করেই চলছে দুই পরিবারের জীবন। সাম্প্রতিক নদীভাঙন ও বন্যা তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে অনেক সময় একবেলা খেয়ে আরেকবেলা না খেয়ে থাকতে হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মাসুক মিয়া বলেন, কামাল মুন্সির পরিবারে ১১জন সদস্য অন্ধ হওয়ায় তাদের জীবনযুদ্ধ অনেক কঠিন। টিনশেডের ছোট্ট একটি ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছে পরিবারটি। দীর্ঘদিন ধরে মানবিক সহায়তা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার প্রত্যাশায় দিন পার করছেন তারা।

তবে কয়েক যুগ পর সম্প্রতি বন্যায় পানিবন্দি হওয়ার কারণে খবর পেয়ে এবার প্রথম জেলা প্রশাসক এবং ইউএনও তাদের বাড়িতে এসেছেন কিছু আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন এবং চিকিৎসা ও যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের আশ্বাস দিয়েছেন। এই পরিবারটির জন্য সরকারি আবাসন, চিকিৎসা সহায়তা এবং স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা করা গেলে তাদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ অনেকটাই লাঘব হবে বলে দাবি করেন স্থানীয়রা।

কামাল মিয়া মুন্সি বলেন, আমরা বাপ-দাদার আমল থেকেই চোখে দেখি না। আমাদের ছেলে-সন্তাান, নাতি-নাতনিও চোখে দেখে না। চোখে না দেখার কারণে আমাদের কোনো কাজকাম নেই। আমাদের অন্যের ওপর নির্ভর করে জীবন চালাতে হয়। বড় অসহায় অবস্থায় আছি।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধি সুফি বেগম জানান, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধির পাশাপাশি আমার ছেলে বাকপ্রতিবন্ধি এবং মেয়ে মানসিক ভারসাম্যহীন। পরিবারের সবাই খুব কষ্টে আছি। নেই থাকার জন্য ভালো একটি ঘর। ঝড়-বৃষ্টি হলে ঘরের বাইরে বৃষ্টি পড়ার আগে ভেতরে পড়ে। সংসারে আয় রোজগারের স্থায়ী ব্যবস্থা নেই। ভাঙা ঘরে বসবাস করছি। সরকার বা সমাজের বিত্তবান মানুষ যদি আমাদের দিকে একটু সুনজর দিতেন, তাহলে অনেক উপকার হতো।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধি সারজক মিয়া বলেন, আমার বাবাও অন্ধ ছিলেন, আমার দাদাও অন্ধ ছিলেন। আমরা চোখে দেখি না, কোনো কাজকর্ম করতে পারি না। আমরা কোনো কিচ্ছু করতে পারি না। মানুষের দয়ায় কিছু খাবার পাই, তা দিয়েই খাই। সুফি বেগম বলেন, আমরা কাজকর্ম করতে পারি না। কেউ আমাদের কাজেও নেয় না। আমরা খুব কষ্ট করে নিজেরা রান্না করে খাই। একবেলা খেলে তিনবেলা খেতে পারি না।

ফখরুল মিয়া বলেন, আগে কোনো সহায়তা পাইনি। এখন বন্যার কারণে সাংবাদিক ভাইয়েরা আসার পর জেলা ও উপজেলা থেকে স্যাররা এসেছেন। তারা কিছু সাহায্য দিয়েছেন। সবাই যদি আমাদের দিকে খেয়াল রাখেন, সাহায্য সহযোগিতা করেন তাহলে আমাদের পরিবার বেঁচে যাবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধি পরিবারের পানিবন্দি ও দুঃখ দুর্দশার খবর পেয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা ও চিকিৎসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত সোমবার বিকেলে রাজনগর উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প বাস্তায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ের পক্ষ থেকে পরিবারটির জন্য নগদ আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

গত মঙ্গলবার জেলা প্রশাসক মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল, রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপুল সিকদারসহ প্রশাসনে অনেক কর্মকর্তারা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধির বাড়িতে সহায়তা নিয়ে আসেন। এ বিষয়ে রাজনগর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আজাদুর রহমান বলেন, পরিবারটির ১১ জনের মধ্যে বর্তমানে ৮ জন প্রতিবন্ধি ভাতা পাচ্ছেন। বাকি তিনজন আবেদন করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপুল সিকদার বলেন, বিষয়টি জানার পর আমরা সরেজমিনে ওই বাড়িতে সহায়তা  পৌছে দিয়েছি। ভবিষ্যতেও তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।

মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, আমি সরজমিনে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সবার সঙ্গে কথা বলেছি। প্রয়োজনীয় সহযোগিতাসহ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে চক্ষু বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে মেডিক্যাল ক্যাম্পের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি তাদের বাড়িতে যাতায়াতের কাঁচা সড়ক দ্রæত সংস্কার ও ঘর নির্মাণে সহায়তা করা হবে।

অপরদিকে রাজনগরের একই গ্রামে গ্রামে জমজ ৩ সন্তান জন্ম দেয়া দরিদ্র রিবিল মিয়া ও সেলিনা দম্পতির পরিবারটিও  অবর্ণনীয় কষ্টে দিনাতিপাত করছে। শিশুদের চিকিৎসা, খাদ্য ও বাসস্থান নির্মাণে সরকারসহ সবার সহযোগিতা চায় এ পরিবারটি। সরকারসহ দেশের ও প্রবাসের বিত্তবানরা এগিয়ে আসলে চরম অসহায় পরিবারটির বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ঠিকে যাবে।

 

একুশে সংবাদ/ওজি

সর্বোচ্চ পঠিত - সারাবাংলা

Link copied!