আষাঢ় মাসেও কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির দেখা নেই। বরং চৈত্রের মতো তীব্র খরতাপে পুড়ছে রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চল, বিশেষ করে কৃষিভিত্তিক তানোর উপজেলা। বৃষ্টির অভাবে ব্যাহত হচ্ছে আমন মৌসুমের জমি প্রস্তুত ও রোপণ কার্যক্রম। এতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা।
কৃষকদের ভাষায়, আষাঢ় মানেই টানা বৃষ্টি। কিন্তু এবার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সেই চিত্র পুরোপুরি উল্টো। প্রচণ্ড গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কৃষক-শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হতে পারছেন না।
উপজেলার যশপুর গ্রামের কৃষক ইনছান আলী বলেন, ‘গত আট-দশ বছরে আষাঢ় মাসে এমন তাপদাহ দেখিনি। এ সময় মাঠে কৃষকদের ব্যস্ত থাকার কথা। কিন্তু বৃষ্টি না থাকায় কাজই শুরু করা যাচ্ছে না।’
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলের অন্যতম কৃষিপ্রধান এলাকা তানোরে ধান, আলু ও মাছের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে রোপা আমন ধানের ওপর নির্ভর করেন অধিকাংশ কৃষক। সাধারণত আষাঢ়ের বৃষ্টির পানিতেই আমন রোপণ সম্পন্ন হয়। পরে সেই জমিতেই আলুর আবাদ করা হয়। কিন্তু এবার বৃষ্টির অভাবে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে সেচের পানি দিয়ে জমি প্রস্তুত করছেন, এতে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে।
মুণ্ডুমালা পৌর এলাকার জগদীশপুর গ্রামের কৃষক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘চার বিঘা জমিতে আমন চাষ করব। এক বিঘা জমি চাষ করেছিলাম, কিন্তু বৃষ্টি না হওয়ায় আবারও চাষ করতে হবে। বাকি জমিগুলো এখনো প্রস্তুত করা যায়নি।’
একই গ্রামের কৃষক লতিফুর রহমান জানান, তিন বিঘা জমি এখনও চাষ করতে পারেননি। কামারগাঁ ইউনিয়নের নেজামপুর গ্রামের প্রবীণ কৃষক বিমল চন্দ্র প্রামাণিক বলেন, ‘জীবনে আষাঢ় মাসে এমন খরা দেখিনি। এ সময় মাঠে ধান রোপণের ধুম পড়ে যাওয়ার কথা, অথচ এখন মাঠ প্রায় ফাঁকা।’
হাতিনান্দা গ্রামের কৃষক কফিলউদ্দিন বলেন, যেসব জমিতে পরে আলুর চাষ হয়, সেসব জমিতে এতদিনে আমন রোপণ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বৃষ্টির অভাবে অনেকেই সেচের পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন।
একই এলাকার হোটেল ব্যবসায়ী আইয়ুব আলী বলেন, ‘এত গরমে বাইরে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ওপর ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট জনদুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।’
স্বশিক্ষিত কৃষিবিজ্ঞানী নুর মোহাম্মদ বলেন, তানোর উপজেলায় প্রায় ২২ হাজার হেক্টর জমিতে রোপা আমনের আবাদ হয়। উপজেলার উর্বর কৃষিজমি দেশের খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু এবার বৃষ্টির অভাবে কৃষকরা হতাশ। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় সেচব্যবস্থা আরও সহজলভ্য করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ প্রয়োজন।
আবহাওয়ার তথ্য অনুযায়ী, শনিবার তানোরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রোববার তা ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলেও আগামী সোমবার ও মঙ্গলবার তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। পূর্বাভাসে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা বলা হয়নি।
তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ বলেন, ‘বৃষ্টির অভাবে অনেক কৃষক এখনো জমি প্রস্তুত করতে পারেননি। আবার কেউ কেউ সেচের পানি ব্যবহার করে রোপণ শুরু করেছেন। চলতি মৌসুমে উপজেলায় ২২ হাজার হেক্টর জমিতে রোপা আমনের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।’
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

