গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার নদীবেষ্টিত এলাকার মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে এক বছর ধরে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে ভাসমান হাসপাতাল ইমপ্যাক্ট ‘জীবন তরী’। চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত নিন্ম আয়ের ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ এ হাসপাতালের মাধ্যমে বিনামূল্যে বা স্বল্প খরচে চিকিৎসা সেবা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন।
গত এক বছরে হাসপাতালটি উপজেলার বিভিন্ন নদীপথসংলগ্ন এলাকা, চরাঞ্চল ও গ্রামের হাজারো রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে। স্বাস্থ্য পরীক্ষা, মাতৃসেবা, শিশুসেবা, চক্ষু ও দাঁতের প্রাথমিক চিকিৎসাসহ নানা ধরনের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে এ হাসপাতাল থেকে।
নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীর পার ধরে ভেসে বেড়াচ্ছে একটি হাসপাতালটি। ১৯৯৩ সালের ২৫ জুলাই সংস্থাটি ট্রাস্ট হিসেবে নিবন্ধন পায়। দাতব্য হাসপাতালটি ইমপ্যাক্ট ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ (আই.এফ.বি) নামের একটি বেসরকারি সংস্থা জাহাজের ওপর ভাসমান হাসপাতালটি চালু করে। ইমপ্যাক্ট ফাউন্ডেশন ১৯৯৯ সালের এপ্রিল মাসে ‘জীবন তরী’ নামে যাত্রা করে ভাসমান হাসপাতাল চালু করে। এটি বিভিন্ন জেলা-উপজেলার একাধিক স্থানে নোঙর ফেলে সুবিধাবঞ্চিত জনসাধারণের চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) সরেজমিনে দেখা যায়, রোগীরা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করছে এবং ভাসমান সিঁড়ি দিয়ে চিকিৎসা নিতে হাসপাতালের ভেতরে যাচ্ছে। হাসপাতালে রয়েছে অপারেশন পরবর্তী রোগীদের জন্য একটি কক্ষ। শীতার্তপ নিয়ন্ত্রিত অপারেশন থিয়েটার ও রোগীদের জন্য আলাদা পৃথক বেড। তাছাড়া এক্স-রে, প্যাথলজিক্যাল ল্যাব, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের জন্য আলাদা কক্ষ এবং বহিঃবিভাগের রোগীদের জন্য অপেক্ষা করার কক্ষ। ভাসমান এ হাসপাতালের সাথে বাঁধা রয়েছে দুটি স্পিডবোড যা জরুরী প্রয়োজনে রোগীদের আনা-নেয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
চিকিৎসাসেবা নিতে আসা একাধিক রোগী ও তার অভিভাবকরা জানায়, সামান্য চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যেতে হতো। এতে সময় ও অর্থ দুটিই ব্যয় হতো। এখন জীবন তরী এলাকায় আসাতে সহজেই চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যায়। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে এ সেবার চাহিদা সবচেয়ে বেশি।
সুশিল সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, “জীবন তরী শুধু একটি হাসপাতাল নয়, এটি অসহায় মানুষের জন্য এক চলমান আশ্রয়স্থল। এটি এলাকার মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর পাশে থেকে এক বছর পূর্ণ করায় ভাসমান হাসপাতাল ‘জীবন তরী’ এখন কালীগঞ্জের মানুষের কাছে মানবতার এক অনন্য উদাহরণ।
হাসপাতালটি চিকিৎসা সেবা দিতে ২০২৫ সালের মে মাস হতে উপজেলার পৌরসভার খাদ্য গুদাম সংলগ্ন শীতলক্ষ্যা নদীর ঘাটে নোঙ্গর করে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে। এর আগেও ভাসমান হাসপাতালটি ২০১৩ ও ২০১৮ সালে এই ঘাটে চিকিৎসা সেবা দিয়েছিল ।
ভাসমান হাসপাতাল ইমপ্যাক্ট জীবন তরীর প্রশাসক এ.কে.এম সহিদুল হক বলেন, নদীর পাড় এলাকায় বসবাসকারী সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র রোগীদের স্বল্প খরচে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। নাক, কান, গলার চিকিৎসা, টনসিল অপারেশন এবং চক্ষু রোগের চিকিৎসা ও অপারেশন ও সহায়ক সামগ্রীর ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে অর্থোপেডিক চিকিৎসা, ঠোঁটকাটা, তালুকাটা রোগীদের চিকিৎসাসেবাসহ অন্যান্য সেবা দেয়া হয়। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত চিকিৎসা সেবা চালু থাকে। এপর্যন্ত প্রায় ১২শ এর অধিক রোগীকে স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ.টি.এম কামরুল ইসলাম একান্ত সাক্ষাতকারে বলেন, “ভাসমান হাসপাতাল ‘জীবন তরী` সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য একটি আশীর্বাদস্বরুপ। এটি স্বাস্থ্যসেবা ও মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নদীবেষ্টিত ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ এই সেবার মাধ্যমে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন। স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে মানবকল্যাণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যা অসুস্থ মানুষের জীবনে আলো ছড়াচ্ছে। সাধারণের মাঝে এর খবরটি পৌছে দিতে গণমাধ্যমের সহযোগীতা ব্যক্ত করেন তিনি।
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

