বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তিস্তা নদীতে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে।
গত এক সপ্তাহে নদীভাঙনে শতাধিক বসতভিটা, তিন শতাধিক একর ফসলি জমি এবং বিভিন্ন সড়ক তিস্তার গর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে আরও দুই শতাধিক বসতভিটা, শত শত একর আবাদি জমি, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। ইতোমধ্যে ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও ভাঙনের মুখে পড়েছে।
উপজেলার কাপাসিয়া, হরিপুর, বেলকা, চন্ডিপুর ও শ্রীপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন চরাঞ্চলে ভাঙন চরম আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. মাজেদুর রহমান ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছেন।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। নামমাত্র কয়েকটি স্থানে জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তা ভাঙন ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে।
কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, কখন বসতভিটা নদীগর্ভে চলে যাবে, সেই আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন চরবাসী। সারা বছরই কমবেশি নদীভাঙন অব্যাহত থাকে। জিও ব্যাগ ও জিও টিউব দিয়েও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস ও কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরগঞ্জে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৫০০টি বসতভিটা ও ৬০০ হেক্টর ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। গত পাঁচ বছরে প্রায় আড়াই হাজার বসতভিটা, তিন হাজার হেক্টর জমি, ৫০ কিলোমিটার সড়ক, ৩০টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তিস্তার গর্ভে হারিয়ে গেছে।
হরিপুর ইউনিয়নের লখিয়ারপাড় গ্রামের বাসিন্দা আল-আমিন মিয়া বলেন, চরের অধিকাংশ পরিবার অন্তত পাঁচ থেকে আটবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছে। গত এক দশক ধরে সারা বছরই ভাঙন চলমান রয়েছে।
নাজিমাবাদ বিএল উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম জানান, উজান থেকে আসা পলি জমে নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় তিস্তার গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে নদীটি বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত হয়ে সময়-অসময়ে ভাঙন সৃষ্টি করছে।
কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মঞ্জু মিয়া বলেন, পানি কমলে উজানে, আর পানি বাড়লে ভাটিতে ভাঙন দেখা দেয়। চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। একটি পরিবারকে বছরে চার থেকে পাঁচবার পর্যন্ত ভাঙনের মুখে পড়তে হয়।
অন্যদিকে কাপাসিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও বিএনপির সাবেক উপজেলা সভাপতি মো. মোজাহারুল ইসলাম বলেন, নদী খনন, ড্রেজিং, সংরক্ষণ ও নদীশাসন ছাড়া তিস্তার ভাঙন রোধ সম্ভব নয়। শুধু জিও ব্যাগ বা জিও টিউব দিয়ে স্থায়ী সমাধান হবে না।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, তিস্তার চরাঞ্চল বর্তমানে ধান, গম, ভুট্টা, বাদাম, কুমড়া, তরমুজ, আলু, মরিচ ও পেঁয়াজ চাষের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এলাকা। কিন্তু প্রতি বছর ভাঙনের কারণে কৃষকদের স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে। প্রতিবছর প্রায় ৩০০ হেক্টর জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মশিয়ার রহমান জানান, উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদীর ভাঙনে প্রতিবছর প্রায় ৪০০ বসতভিটা, ৩০০ হেক্টর জমি, বিভিন্ন সড়ক ও প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ বিষয়ে নিয়মিত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে তথ্য পাঠানো হচ্ছে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, স্থায়ীভাবে নদীভাঙন রোধের বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের পক্ষ থেকে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য প্রেরণ করা হচ্ছে। তবে নদী খনন, ড্রেজিং ও নদীশাসন ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. মাজেদুর রহমান বলেন, বিভিন্ন চরাঞ্চলে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। আমি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছি এবং ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। আপাতত পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে জিও ব্যাগ ফেলার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
চরবাসীর দাবি, বারবার ভাঙনের শিকার হয়ে তারা নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। তিস্তা নদীর স্থায়ী নদীশাসন ও ভাঙন প্রতিরোধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে সুন্দরগঞ্জের মানচিত্রই পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

