আড়িয়াল খাঁ ও কুমার নদবেষ্টিত প্রাচীন জনপদ মাদারীপুর। ১৮৭৫ সালে নদীভিত্তিক বাণিজ্যের সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল এই পৌরসভা।
একসময় এই জনপদের রক্তনালীর মতো ছড়িয়ে ছিল অর্ধশতাধিক খাল, যা শহরের পানি নিষ্কাশন, নৌ-যোগাযোগ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করত। তবে কালের বিবর্তনে প্রভাবশালী মহলের দখল আর অব্যবস্থাপনার কারণে আজ সেই ঐতিহ্যবাহী খালগুলো অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে।
স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠদের দেওয়া তথ্যমতে, একসময় মাদারীপুর পৌর এলাকায় খালের সংখ্যা ছিল ৫০টিরও বেশি। প্রতিটি খাল আড়িয়াল খাঁ অথবা কুমার নদের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। তৎকালীন সময়ে এই খালগুলো ব্যবহার করে পণ্যবাহী বড় নৌকা চলাচল করত, যা শহরের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।
তবে পৌরসভার বর্তমান নথিপত্রে মাত্র ২২টি খালের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই সংখ্যাটিও কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। বাস্তবে অধিকাংশ খালই এখন সরু নালায় পরিণত হয়েছে অথবা বহুতল ভবনের নিচে চাপা পড়েছে।
খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় মাদারীপুর শহরের প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পৌর এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া জলজ উদ্ভিদ ও মাছের প্রজনন ক্ষেত্র নষ্ট হওয়ায় জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে।
স্থানীয় বাসিন্দা ইরাদ মুন্সী আক্ষেপ করে বলেন, "শৈশবে দেখেছি এই খালগুলো দিয়ে নৌকা চলত, মানুষ পণ্য আনা-নেওয়া করত। এখন অনেক খালের জায়গায় রাস্তা বা ঘরবাড়ি হয়ে গেছে। খালের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া ভার।"
অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ (সভাপতি, মাদারীপুর উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদ): তিনি জানান, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে খালের কোনো বিকল্প নেই। দ্রুততম সময়ে এসব খাল উদ্ধার করা এখন গণদাবিতে পরিণত হয়েছে।
অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম মিয়া (মানবাধিকার কর্মী): তিনি মনে করেন, খাল হারানো মানে একটি নগরের প্রাণ হারানো। আড়িয়াল খাঁ ও কুমার নদের সঙ্গে এই সংযোগগুলো পুনরায় স্থাপন করা না গেলে ভবিষ্যতে মাদারীপুর শহর বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।
খাল উদ্ধারের বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন মাদারীপুর পৌরসভার প্রশাসক জেসমিন আক্তার বানু। তিনি বলেন, "বর্তমান সরকার খাল খনন ও পুনরুদ্ধারে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আমরা ইতোমধ্যে বিলুপ্ত ও দখল হওয়া খালের তালিকা প্রণয়ন করেছি। পর্যায়ক্রমে খনন কাজের মাধ্যমে এই প্রাকৃতিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।"
মাদারীপুরের ইতিহাস ও পরিবেশ রক্ষায় দখলদারদের উচ্ছেদ করে খালগুলো পুনঃখনন করা এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনের সদিচ্ছা এবং স্থানীয় জনগণের সচেতনতাই পারে এই মৃতপ্রায় খালগুলোকে পুনরায় জীবন দান করতে।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

