প্রাচীন লালমাই পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা বৌদ্ধ সভ্যতার নিস্তব্ধতা থেকে শুরু করে গোমতী তীরের আধুনিক বহুতল ভবনের ব্যস্ততা-কুমিল্লা যেন এক জীবন্ত মহাকাব্য। সপ্তম শতাব্দীর প্রত্নতাত্ত্বিক ঐশ্বর্য আর ২০২৬ সালের মেগা প্রজেক্টের মেলবন্ধনে এই জেলা এখন বাংলাদেশের এক অনন্য অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক হাবে পরিণত হয়েছে। ঐতিহ্যের শেকড় আঁকড়ে ধরে কুমিল্লা এখন উন্নয়নের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।
ইতিহাসের বিবর্তন: ময়নামতি থেকে আধুনিক জনপদ
কুমিল্লার জয়গান শুরু হয় প্রাচীন ‘সমতট’ জনপদ থেকে। ময়নামতি, শালবন বিহার, ইটাখোলা মুড়া আর রূপবান মুড়া জানান দেয় আজ থেকে প্রায় তেরোশো বছর আগে এই মাটি ছিল এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ। সেই প্রাচীন শৌর্য আজও কুমিল্লার পরতে পরতে মিশে আছে। ময়নামতি জাদুঘরে সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদগুলো কেবল পর্যটনের অনুষঙ্গ নয়, বরং বাংলার সমৃদ্ধ অতীতের এক প্রামাণ্য দলিল। রাজা আনন্দ দেবের রাজত্বকাল থেকে শুরু করে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে কুমিল্লার মাটি বারবার গর্জে উঠেছে।
খাদি ও রসমালাই: বিশ্বজয়ী দুই সিগনেচার
কুমিল্লার নাম নিলেই অবলীলায় চলে আসে ‘খাদি’ আর ‘রসমালাই’।
খাদি ও রসমালাই: বিশ্বজয়ী দুই সিগনেচার
কুমিল্লার নাম নিলেই অবলীলায় চলে আসে ‘খাদি’ আর ‘রসমালাই’। মহাত্মা গান্ধীর স্বদেশী আন্দোলনের অনুপ্রেরণায় যে খাদি শিল্পের বিকাশ ঘটেছিল, তা আজও কুমিল্লার আভিজাত্যের প্রতীক। হাতে বোনা এই কাপড়ের আবেদন এখন দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন দুনিয়ায় জায়গা করে নিয়েছে।
অন্যদিকে, ১৯০০ সালের গোড়ার দিকে মনোহরপুর থেকে শুরু হওয়া ‘মাতৃভাণ্ডারের’ রসমালাইয়ের স্বাদ আজ কিংবদন্তি। এই দুই ঐতিহ্য কুমিল্লাকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র ভৌগোলিক পরিচিতি (GI Status)।
উন্নয়নের নব দিগন্ত: আধুনিক অবকাঠামো
ঐতিহ্যের সমৃদ্ধিকে সঙ্গী করেই কুমিল্লা আজ উন্নয়নের মহাসড়কে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ‘লাইফলাইন’ হিসেবে খ্যাত এই জেলা এখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ট্রানজিট পয়েন্ট।
* যোগাযোগ বিপ্লব: ফোর-লেন মহাসড়ক এবং সুপরিকল্পিত বাইপাস রোডগুলোর কারণে কুমিল্লার সাথে রাজধানীর দূরত্ব এখন সময়ের হিসেবে একেবারেই নগণ্য। প্রস্তাবিত হাই-স্পিড রেলওয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে কুমিল্লা হবে ঢাকার নিকটতম স্যাটেলাইট সিটি।
* স্মার্ট সিটি ও আইটি: শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টারের মাধ্যমে জেলার হাজার হাজার তরুণ এখন ফ্রিল্যান্সিং ও তথ্যপ্রযুক্তিতে বিপ্লব ঘটাচ্ছে। কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন এলাকাকে ডিজিটাল সেবার আওতায় এনে একটি আধুনিক ‘স্মার্ট সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।
শিক্ষা ও অর্থনীতি: আগামীর সম্ভাবনা
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ এবং শতবর্ষী ভিক্টোরিয়া কলেজকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলটি একটি আধুনিক ‘নলেজ হাবে’ পরিণত হয়েছে।
এর পাশাপাশি কুমিল্লা ইপিজেড ও বিসিক শিল্পনগরী জেলার অর্থনৈতিক ভিত্তিকে করেছে শক্তিশালী। কৃষি ক্ষেত্রেও আধুনিক সেচ ও যান্ত্রিকীকরণের ফলে গোমতী অববাহিকা এখন দেশের অন্যতম প্রধান শস্যভাণ্ডার।
এক নজরে কুমিল্লার উন্নয়ন ও ঐতিহ্যের চিত্রপট:
সমাপনী: বিভাগের পথে আগুয়ান
ড. আখতার হামিদ খানের প্রবর্তিত ‘কুমিল্লা মডেল’ বা বার্ড (BARD) এক সময় সারাবিশ্বকে পল্লী উন্নয়নের পথ দেখিয়েছিল। আজ সেই একই উদ্ভাবনী শক্তিতে কুমিল্লা নিজেকে নতুন করে সাজাচ্ছে।
কুমিল্লাকে ‘বিভাগ’ করার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হলে এই অঞ্চলের গতিশীলতা আরও বহুগুণ বেড়ে যাবে।
ইতিহাসের ধূলিকণা আর আধুনিকতার ইস্পাত-কংক্রিটের মিশেলে কুমিল্লা আজ কেবল একটি জেলা নয়; বরং এটি আগামীর উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশের এক সার্থক প্রতিচ্ছবি।



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

