আইন লঙ্ঘন করে মৌলভীবাজারের বিভিন্ন উপজেলায় অবৈধ ইটভাটায় অবাধে ইট পোড়ানো হচ্ছে। কৃষিজমি ও লোকালয়ে এসব ইটভাটার কার্যক্রম চলছে।
ইটভাটার চিমনির কালো ধোঁয়ায় দূষিত হচ্ছে পরিবেশ।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরে মৌলভীবাজার জেলায় ৪৫টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে সব ইটভাটাই অবৈধ।
২৩টি ভাটার ছাড়পত্র থাকলেও শর্ত পূরণ করতে না পারায় বর্তমানে সেগুলোও বাতিল করা হয়েছে।
এছাড়া ২২টি ইটভাটা শুরু থেকেই অবৈধ। তবে প্রশাসনের এই নিষেধাজ্ঞাকে তোয়াক্কা না করে মালিকপক্ষ উচ্চ আদালতে রিট করে বছরের পর বছর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন মালিকপক্ষ। যা নিয়ে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাঈদুল ইসলাম।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন যেন শুধু কাগজে-কলমেই। মৌলভীবাজার জেলার ভাটার মালিকদের কেউ এ আইন মানছেন না। সব ভাটার আশপাশেই রয়েছে মানুষের বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। জেলার বিভিন্ন ইটভটা ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন জায়গা থেকে মাটি এনে পাহাড় সমান উঁচু করে রাখা হচ্ছে ইট ভাটায়। বেশিরভাগ মাটি তিন ফসলি জমি থেকে কেটে আনা হচ্ছে।
একেক ভাটায় বছরে ২০ থেকে ৩০ লাখ ইট পুড়ানো হয়। ইট পুড়ানোর জন্য জ্বালানি হিসেবে গাছের খন্ড ব্যবহার করা হচ্ছে। জেলার কুলাউড়া, কমলগঞ্জ, জুড়ী, বড়লেখা, রাজনগর, শ্র্রীমঙ্গল ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ঘনবসতি এলাকা, সড়কের পাশে ভাটা রয়েছে। এছাড়া এক কিলোমিটারর মধ্যে ৩-৪ টি ইট ভাটা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দিন-রাত কালো ধোঁয়ায় আকাশ ঢেকে থাকে। শিশু ও বৃদ্ধদের শ্বাসকষ্ট বেড়েছে। বাড়ির ছাদ, গাছপালা ও পুকুরে ছাই পড়ে ক্ষতি হচ্ছে। প্রতিবছরই এসব অবৈধ ইটভাটা বন্ধে লোক দেখানো অভিযান চালায় প্রশাসন। কিন্তু এ অভিযানে কোনো ভাটা বন্ধ হয় না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সাময়িক জরিমানা করে প্রশাসন চলে যায়। যাওয়ার পরপরই আবার পুরোদমে ইটভাটার কার্যক্রম শুরু হয়। কার্যকর অভিযান থাকলে অবৈধ ইটভাটা স্থাপনে মালিকেরা নিরুৎসাহিত হতেন।
জেলার রাজনগর উপজেলার কৃষক রেজাউল করিম বলেন, গ্রামে একসময় ছিল ধান ও সবজির জমি। এখন সেখানে সারি সারি ইটভাটা। জমির মাটি কেটে নেওয়ায় ফসল উৎপাদন কমে যাচ্ছে। কমলগঞ্জের আরেক কৃষক ফারুক মিয়া বলেন, উর্বর মাটি কেটে নেওয়ায় জমির ফলন কমে গেছে। দ্রæত ব্যবস্থা না নিলে চাষাবাদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবো।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, মৌলভীবাজারে প্রতি বছর প্রায় দুই থেকে আড়াই কোটি ঘনফুট ফসলি জমির মাটি ভাটায় চলে যাচ্ছে, যার ফলে জমিগুলো দীর্ঘ মেয়াদে অনুর্বর হয়ে পড়ছে এবং ফসল উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
জেলা পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় মোট ৪৫টি ইটভাটা রয়েছে। সব ইটভাটা পরিবেশগত ছাড়পত্র ও লাইসেন্স ছাড়াই অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এসব ইটভাটা কৃষি জমির টপসয়েল দিয়ে ইট তৈরি করা হয়।
জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করে মাটি পোড়ানো হয়। ইট ভাটার মালিক পক্ষরা উচ্চ আদালতে রিট করে এসব ভাটা চালিয়ে যাচ্ছেন। এসব ভাটা শুধু অবৈধভাবে চলছে না। ভাটার জন্য অবৈধভাবে ফসলি জমির টপ সয়েল কেটে পাহাড় সমান মাটি মজুদ করে রাখা হচ্ছে। যা সম্পূর্ণ আইন বিরোধী।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন অনুযায়ী, লোকালয়, কৃষিজমি ও টিলার নির্দিষ্ট দূরত্বে ইটভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ। কৃষিজমির মাটি দিয়ে ইট তৈরিতেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। আইনের ৫ (১) ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে ইট তৈরির জন্য পাহাড়, টিলা ও কৃষিজমি থেকে মাটি নেওয়া যাবে না।
এ আইন লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩-এ বলা হয়েছে, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ ও উন্নয়নের স্বার্থে আধুনিক প্রযুক্তির ইটভাটা স্থাপন করতে হবে। কৃষি জমি, পাহাড়, টিলা থেকে মাটি কেটে ইটের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করতেও নিষেধ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ভাটা মালিক জানান, ছাড়পত্র নবায়ন ও অনুমোদন পেতে দীর্ঘসূত্রতা থাকায় জটিলতা তৈরি হয়।
তারা দাবি করেন, ইটভাটা শিল্প স্থানীয় কর্মসংস্থান ও নির্মাণখাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সরকার অনুমোদন প্রক্রিক্রয়া সম্পন্ন করলে তারা বৈধতার আওতায় আসতে পারবেন বলে মত দেন। একাধিক ভাটার মালিকরা জানান, বেশিরভাগ ইটভাটা মামলা জটিলতা রয়েছে। উচ্চ আদালতে রিট করে বৈধতা নিয়ে মালিকরা ভাটা পরিচালনা করছেন।
পরিবেশবাদী সংগঠন ও সচেতন নাগরিকরা অবৈধ ভাটার তালিকা প্রকাশ, নিয়মিত তদারকি এবং আইন অনুযায়ী বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে জেলার পরিবেশ ও কৃষি উভয় খাতই বড় ধরনের সংকটে পড়বে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কার্য পরিষদের সদস্য আ.স.ম সালেহ সোহেল বলেন, জেলার প্রায় সব ভাটাই পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া চলছে। আইন অনুযায়ী কৃষিজমি ও বসতবাড়ির পাশে ভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ হলেও তা মানা হচ্ছে না। কালো ধোঁয়া, চিমনির ছাই ও মাটি কাটার ফলে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, কোনোভাবেই কৃষি জমির টপসয়েল কাটা যাবে না। উর্বর টপসয়েল অপসারণের ফলে জমির উৎপাদনক্ষমতা কমছে এবং দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কৃষিজমি রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বিত অভিযান চালানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো: মাঈদুল ইসলাম জানান, জেলায় ৪৫টি ইটভাটা রয়েছে। সব ভাটা অবৈধভাবে চালানো হচ্ছে। শর্তপূরণ না করায় চলতি বছর পর্যন্ত ২৩টি ভাটার পরিবেশ ছাড়পত্র বাতিল করা হয়েছে। বাকি ২২টিও অবৈধভাবে চলছে। বেশিরভাগ ভাটা আদালত থেকে রিট করে চালানো হচ্ছে। সময় শেষ হওয়ার আগেই আবার সময় বাড়িয়ে নেন তাঁরা।
মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তানভীর হোসেন বলেন, অবৈধ ইটভাটা বন্ধে জেলা প্রশাসন কাজ শুরু করেছে। ইতোমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও জরিমানা করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের সাথে আলোচনা করে আবার অভিযান পরিচালনা করা হবে।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

