সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের রংচী গ্রামের সংলগ্ন প্রাচীন কালের হিজল বাগানে উঠেছে দখলের হিড়িক।
এখন চলে গেছে ধ্বংসের দাড়প্রান্তে। স্থানীয় কিছু অসাধু লোভী মানুষ দখলের হিড়িক তুলায় বাগানটি এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম টাঙ্গুয়ার হাওর পাড়ের বৈশিষ্ট্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলি সুযোগ সন্ধানীরা কেটে উজাড় করছে হিজল বাগানটি, সরকারের ডিসি খতিয়ানের জায়গায় হিজল বাগানটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট করছে স্থানীয় একটি মহল। অথচ দেখার মতো কেউ নেই।
দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে হিজল বাগানের গাছ পর্যায়ক্রমে কেটে নষ্ট করছে প্রাকৃতিক পরিবেশ। দখলদাররা ধীরে ধীরে মাটি তুলে নিয়ে জমি সমতল করে, কৃষি জমিতে রূপান্তর করায়, বাগানটির অস্তিত্ব সংকটে পড়তে দেখা গেছে। স্থানীয়দের দাবি—প্রায় তিন শতাধিক বছরের সাক্ষী এ হিজল বনটি রক্ষা করতে জরুরি ভিত্তিতে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া খুবই প্রয়োজন।
হিজল গাছের অনেক উপকারীতা আছে, এর মধ্যে কিছু হলো-হিজল গাছের ছাল জ্বরের জন্য উপকারী-এর পাতা পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়-হিজল গাছের ফল ভাজা করে খাওয়া যায়,হিজল গাছ পরিবেশের জন্য ভালো, কারণ এটি বাতাস পরিষ্কার করতে সাহায্য করে।
সরজমিনে গিয়ে বনে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে অনেক গাছের গোড়ায় মাটি নেই। কিছু গাছ গোড়া কেটে মাটিতে ফেলে রাখা হয়েছে । আবার কোনো কোনো গাছ মাটিবিহীন অবস্থায় দুর্বল হয়ে হেলে পড়তে দেখা গেছে। স্থানীয়রা জানান, একসময় রংচী গ্রামের সামনে বিস্তৃত হিজল বাগানটি ছিল বিশাল আকারে। হাওর পাড়ের রংচী গ্রামের পরিচয়ের প্রধান অংশ ছিল হিজল বাগান। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে একে একে গাছ কেটে নেওয়ার ফলে হিজল বনটির আয়তন ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। বর্তমানে বনের ভেতরের মাটি সমতল করে বোরোধান রোপণের দৃশ্যও হরহামেশা চোখে পরে। জায়গাটির শ্রেনী পরিবর্তন করে ধান চাষাবাদ করছে কিছু অসাধু ব্যক্তিরা। এতে গাছের গোড়ার মাটি সরে গিয়ে অনেক গাছ নষ্ট হতেও দেখা দিয়েছে।
প্রবীণদের মতে, প্রায় ৩০০ বছর আগে রংচী গ্রামে প্রথম বসতি স্থাপনের অন্যতম কারণ ছিল এই হিজল বনটি। বর্ষায় হাওরের ঢেউ, ঝড়, বন্যা কিংবা অতিবৃষ্টির সময় বনটি গ্রামটির ঢাল হিসাবে কাজ করত। বনের গাছগুলো প্রাকৃতিক বাঁধের মতো পানি প্রতিরোধ করায় ভাঙন, ক্ষয় বা পানির চাপ তেমনটা প্রভাব ফেলতে পারত না। তাই গ্রামের লোকদের কাছে বনটি শুধু একটি ঝুম বা বাগান নয়, বরং নিরাপত্তারও প্রতীক।
গ্রামবাসী বাবুল মিয়া বলেন, একসময় এই বনে দাঁড়িয়ে থাকা গাছ দেখে মনে হতো একটা জীবন্ত দেয়াল। এখন গাছ কমে গেছে, জায়গাগুলো ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। আরেক কৃষক আনোয়ার মিয়ার ভাষ্য, প্রথমে গাছের গোড়ায় সার দেওয়া হয়, পরে তা নরম হয়ে গেলে গাছ মারা যায়। এরপর গাছ সরিয়ে এখানে ধান ফসল করা হয়। বছরের পর বছর এভাবেই বাগানটি উজাড় করতে মেতে উঠেছে স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে ইউপি সদস্য নুরুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, এটি আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ। এই সম্পদ সংরক্ষণ না করলে, বনটি স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাবে। গাছের গোড়ায় বাঁধাই, নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে, বনের ভেতর ধান চাষাবাদ বন্ধ করতে হবে, এবং নতুন চারা রোপণের ব্যবস্থা নেওয়া খুবই জরুরি।
মধ্যনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উজ্জ্বল রায় জানান, রংচী গ্রামের শতবর্ষী হিজল বাগানটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত সম্পদ। বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। হিজল বাগানে অবৈধভাবে গাছ কাটা, মাটি অপসারণ কিংবা কৃষিকাজ করার কোনো সুযোগ নেই। তদন্ত সাপেক্ষে দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

