মাত্র দেড় বছর বয়সে জবেদা আক্তারের বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়। প্রথমে বাবা মো. জামিনুর এবং কয়েক বছর পর মা মোছা. ঝর্ণা আক্তার অন্যত্র বিয়ে করে আলাদা সংসার শুরু করেন। বাবা-মা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নানা-নানীর আশ্রয়ে বড় হতে থাকেন জবেদা আক্তার। নানা জয়নাল, নানী মোছা. লাইলী ও মামাদের স্নেহেই তিনি বেড়ে ওঠেন।
জামালপুরের এবারের ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল (টিআরসি) পদে চাকরি পেয়েছেন এই জবেদা আক্তার (১৮)। সরকারি চাকরি পাওয়ার আনন্দে তার চোখে পানি চলে আসে।
মেলান্দহ উপজেলার দুরমুট নয়াপাড়া এলাকার জবেদা আক্তার বলেন, “নানা-নানী ও মামার সংসারে থেকে লেখাপড়া করেছি। বাবা-মায়ের আদর পাইনি, তারা থেকেও যেন নেই। আমার চলার পথ সহজ ছিল না। মেলান্দহ উপজেলার কলাবাধা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করে বর্তমানে টনকি বাজারস্থ আলেয়া আজম কলেজে দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়ছি। ভাবিনি সরকারি চাকরি হবে। বাড়ি থেকে একাই পুলিশ লাইন্সে এসেছি পরীক্ষা দিতে, আমার সঙ্গে কেউ আসেনি। মাত্র ১২০ টাকায় চাকরি পেয়ে আমি ভীষণ খুশি।”
শুধু জবেদা আক্তার নন, জামালপুরে মাত্র ১২০ টাকায় পুলিশে চাকরি পেয়েছেন আরও ৩১ জন তরুণ-তরুণী। তাদের মধ্যে ২৯ জন ছেলে ও ৩ জন মেয়ে। কোনো তদবীর বা অনৈতিক লেনদেন ছাড়াই শুধুমাত্র শারীরিক যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে চাকরি হওয়ায় তারা উচ্ছ্বসিত।
রবিবার (৩১ আগস্ট) বিকেলে জেলা পুলিশ লাইন্সের ড্রিল শেডে ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল (টিআরসি) পদে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিতদের নাম ঘোষণা করেন পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম।
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চেংটিমারী গ্রামের কোরআনে হাফেজ মো. রুহেল মিয়া (১৯) জানান, “এবার তৃতীয়বার পরীক্ষায় অংশ নিয়ে চাকরি পেলাম। আগে দেখেছি সবাই নিজ যোগ্যতায় চাকরি পেয়েছে, তাই হাল ছাড়িনি। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর কাছে শুকরিয়া।”
মশিউর রহমান (১৯), আনোয়ার হোসেন (১৮), তাপসী তৃষা (২০)সহ আরও কয়েকজন নিয়োগপ্রাপ্ত বলেন, “ভাবতাম পুলিশে চাকরি পেতে অনেক তদবীর করতে হয়, লাখ লাখ টাকা ঘুষ লাগে। কিন্তু এত স্বচ্ছ নিয়োগ হবে ভাবিনি। এবার নিজের যোগ্যতায় চাকরি হওয়ায় আমরা গর্বিত।”
পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, “২৪ জুলাইয়ের বিপ্লব ও ৫ আগস্টের পর সাধারণ মানুষ যে জনআকাঙ্ক্ষার পুলিশ দেখতে চায়, সেটি গড়ে তুলতে হলে স্বচ্ছ নিয়োগই প্রথম শর্ত। সারাদেশেই এভাবেই নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানাই, তারা যেন সন্তানদের পুলিশে যোগ দিতে উৎসাহিত করেন।”
এবার জামালপুরে ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল পদে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন আবেদন করেন। যাচাই-বাছাই শেষে ৮০৩ জন লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন। সেখান থেকে ৭৩ জন মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেন, আর চূড়ান্তভাবে নিয়োগ পেয়েছেন ৩২ জন। এর মধ্যে ২৯ জন পুরুষ, ৩ জন নারী, একজন মুক্তিযোদ্ধা কোটায় এবং আরও ৬ জন অপেক্ষমাণ তালিকায় রাখা হয়েছে।
একুশে সংবাদ/জা.প্র/এ.জে