সাতক্ষীরায় জেলা প্রশাসকের বাংলোর দেয়াল থেকে ‘জুলাই আন্দোলন’-স্মৃতিবাহী গ্রাফিতি মুছে ফেলা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীসহ সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, পোস্ট অফিস ও ফুড অফিসসংলগ্ন ডিসি বাংলোর দীর্ঘ দেয়ালজুড়ে সম্প্রতি সাদা রঙ করে মুছে ফেলা হয়েছে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আঁকা নানা গ্রাফিতি। এসব দেয়ালে শিক্ষার্থীরা লিখেছিলেন স্বৈরাচারবিরোধী স্লোগান, ভালোবাসা ও মানবতার জয়ধ্বনি। তাদের আঁকা গ্রাফিতিতে ছিল— ‘ভয়ে কাঁপে কাপুরুষ, লড়ে যায় বীর’, ‘স্বাধীনতার সূর্যোদয়, রক্তে রাঙা শিকল ভাঙা’, ‘পানি লাগবে পানি’, ‘৩৬-শে জুলাই’, ‘মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম’ ইত্যাদি শ্লোগান ও চিত্র। এগুলো শুধু দেয়ালকে নতুন রূপ দেয়নি, বরং শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন, সাম্য ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার আহ্বানও প্রকাশ করেছিল।
শিক্ষার্থীদের দাবি, তারা পেশাদার শিল্পী না হয়েও শিল্পের সুষমায় দেয়ালে প্রকাশ করেছিলেন সমাজ ও রাষ্ট্র বদলের আকাঙ্ক্ষা। স্থানীয় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এ গ্রাফিতি অঙ্কনে অংশ নিয়েছিলেন। এতে শহরের পথঘাটে এক ধরনের প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ কয়েক দিনের মধ্যে সেসব গ্রাফিতি সাদা রঙে ঢেকে দেওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
এ ঘটনায় শুক্রবার (২৯ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকেই নিন্দা জানিয়ে লিখেছেন, ‘জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস মুছে ফেলা হলো দেয়াল থেকে।’ শহরের এক কলেজশিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা দেয়ালে যে স্বপ্ন, যে ইতিহাস লিখেছিলাম—তা হঠাৎ মুছে ফেলা কেবল দেয়ালের রঙ মুছে ফেলা নয়, আমাদের আকাঙ্ক্ষাকেও মুছে ফেলার মতো।”
শিক্ষার্থী ও সচেতন মহলের অনেকে এ ঘটনার জন্য জেলা প্রশাসককে দায়ী করছেন। তাদের অভিযোগ, জেলা প্রশাসকের বাংলোর দেয়াল হলেও এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আন্দোলনকারী তরুণদের অনুভূতি ও জনগণের অংশগ্রহণ বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাতক্ষীরার সদ্য সাবেক আহ্বায়ক আরাফাত হোসাইন বলেন, “জুলাই গ্রাফিতি মুছে ফেলার ঘটনায় আমি তীব্র প্রতিবাদ জানাই। যে কারণেই এটি মুছে ফেলা হোক না কেন, কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে পুনরায় জুলাই গ্রাফিতি অঙ্কনের ব্যবস্থা করা। জেলা প্রশাসক যদি এটি না করেন, তবে তিনি কার্যত জুলাইয়ের শহীদ, আহত ও যোদ্ধাদের বিপরীতে অবস্থান করবেন।” তিনি আরও বলেন, “যারা জুলাইয়ের ইতিহাস মুছে ফেলতে চায়, তারাই প্রকৃত ফ্যাসিস্ট। এই গ্রাফিতির মধ্যেই ফুটে উঠেছিল আগামীর বৈষম্যহীন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। সেটি মুছে ফেলা কোনোভাবেই শুভ ইঙ্গিত নয়।”
জুলাই আন্দোলনের প্রথম সংগঠক মোহাম্মদ ইমরান হোসেন বলেন, “জেলা প্রশাসন ২০২৪ সালের ২৬-২৭ আগস্টের পর থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেছে। এক পক্ষকে অন্য পক্ষের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে নিজেদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ধামাচাপা দিতে চাইছে। এর মাধ্যমে জুলাই আন্দোলনের মূল স্পিরিট ও মূল্যবোধকে বিনষ্ট করা হয়েছে।”
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোস্তাক আহমেদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
একুশে সংবাদ/সা.প্র/এ.জে