AB Bank
  • ঢাকা
  • শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬,

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad QR Code
BBS Cables
Janata Bank
  1. জাতীয়
  2. রাজনীতি
  3. সারাবাংলা
  4. আন্তর্জাতিক
  5. অর্থ-বাণিজ্য
  6. খেলাধুলা
  7. বিনোদন
  8. শিক্ষা
  9. তথ্য-প্রযুক্তি
  10. অপরাধ
  11. প্রবাস
  12. রাজধানী

স্বাস্থ্যখাতে জবাবদিহিতার নতুন অধ্যায়: আদ্-দ্দীনের লাইসেন্স বাতিল



স্বাস্থ্যখাতে জবাবদিহিতার নতুন অধ্যায়: আদ্-দ্দীনের লাইসেন্স বাতিল

স্বাস্থ্যসেবা কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্য নয়; এটি মানুষের জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত একটি মৌলিক অধিকার। একজন রোগী যখন হাসপাতালের দ্বারস্থ হন, তখন তিনি শুধু চিকিৎসা গ্রহণ করেন না, বরং নিজের জীবনকে চিকিৎসক, নার্স ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার ওপর আস্থার সঙ্গে সমর্পণ করেন। সেই আস্থার প্রতিদানে যদি অবহেলা, অদক্ষতা, বিশৃঙ্খলা কিংবা দায়িত্বহীনতার কারণে প্রাণহানি ঘটে, তবে তা কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়—এটি মানবতার বিরুদ্ধে এক গুরুতর অপরাধ।

সম্প্রতি রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্দীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্তে অবহেলা ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এটি শুধু একটি হাসপাতালের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়; বরং বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

মে মাসের শেষ দিকে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যু পুরো জাতিকে নাড়া দেয়। তদন্তে হাসপাতালের বিভিন্ন স্তরে গুরুতর অব্যবস্থাপনা, দায়িত্ব পালনে গাফিলতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির বিষয় উঠে আসে। এমন একটি ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—যেখানে নবজাতকদের মতো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার কথা, সেখানে কীভাবে এমন বিপর্যয় ঘটতে পারে?

একটি নবজাতকের মৃত্যু যেমন একটি পরিবারের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎকে ভেঙে দেয়, তেমনি একসঙ্গে ছয়টি নবজাতকের মৃত্যু পুরো সমাজের বিবেককে আহত করে। যে মা-বাবারা সন্তানের আগমনের আনন্দে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনছিলেন, তাদের কোল শূন্য হয়ে গেছে। কোনো ক্ষতিপূরণ, কোনো দুঃখপ্রকাশ কিংবা প্রশাসনিক ব্যাখ্যা এই অপূরণীয় ক্ষতি পূরণ করতে পারে না।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ রয়েছে। অনেক বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক পর্যাপ্ত জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি কিংবা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কোথাও আইসিইউর মান নিয়ে প্রশ্ন, কোথাও প্রশিক্ষিত নার্সের অভাব, আবার কোথাও জরুরি চিকিৎসাসেবার সক্ষমতাই অপ্রতুল। কিন্তু এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা যায়।

এই প্রেক্ষাপটে আদ্-দ্দীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করে—মানুষের জীবন নিয়ে অবহেলা করলে কোনো প্রতিষ্ঠানই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। তবে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সমতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যদি একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে একই ধরনের অপরাধে অভিযুক্ত অন্য হাসপাতাল, ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধেও সমানভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় জনগণের মনে আইনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হবে।

স্বাস্থ্যখাতের আরেকটি বড় সংকট হলো নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দুর্বলতা। কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পর তদন্ত কমিটি গঠন ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অবশ্যই প্রয়োজনীয়; কিন্তু তার চেয়েও বেশি জরুরি দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। নিয়মিত পরিদর্শন, মান নিয়ন্ত্রণ, জনবল যাচাই, নিরাপত্তা অডিট এবং চিকিৎসাসেবার গুণগত মূল্যায়ন নিশ্চিত না হলে এ ধরনের ঘটনা পুনরায় ঘটার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

এ ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কারণ জনগণ দেখতে চায়, রাষ্ট্র তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কতটা আন্তরিক। যদি এই অবস্থান ধারাবাহিকভাবে বজায় থাকে, তবে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের পথ আরও সুগম হবে।

তবে মানবিক দৃষ্টিকোণও উপেক্ষা করা যাবে না। একটি বড় হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সেখানে চিকিৎসাধীন শত শত রোগীর সেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে যেন সাধারণ রোগীরা নতুন সংকটে না পড়েন, সে বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

এই ঘটনা আমাদের সামনে আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরেছে—বাংলাদেশে চিকিৎসাসেবা কি ধীরে ধীরে মানবিক সেবা থেকে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে পরিণত হচ্ছে? যখন মুনাফা অর্জনই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তখন রোগী ও সেবার মান অনেক ক্ষেত্রেই গৌণ হয়ে পড়ে। এর ফলে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে অবহেলা দেখা দেয়। আর সেই অবহেলার চূড়ান্ত মূল্য দিতে হয় নিরীহ রোগীদের।

একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় নির্ভর করে তার স্বাস্থ্যব্যবস্থার মানের ওপর। যেখানে একজন দরিদ্র মানুষও সম্মান, নিরাপত্তা ও আস্থার সঙ্গে চিকিৎসাসেবা পায়, সেখানেই প্রকৃত উন্নয়নের প্রতিফলন ঘটে। আধুনিক ভবন, আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন বা বাহ্যিক চাকচিক্য দিয়ে স্বাস্থ্যসেবার মান নির্ধারণ করা যায় না; সেটি নির্ধারিত হয় রোগীর নিরাপত্তা, চিকিৎসার গুণগত মান এবং প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতার মাধ্যমে।

আদ্-দ্দীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল তাই একটি সতর্কবার্তা। এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, দেশের সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকের জন্য শিক্ষা। স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের উপলব্ধি করা উচিত যে অবহেলার মূল্য কখনো কখনো মানুষের জীবন।

আমরা আশা করি, ছয় নবজাতকের এই করুণ মৃত্যু বৃথা যাবে না। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও মাননিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। একই সঙ্গে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করে ভবিষ্যতে যেন আর কোনো মা-বাবাকে এমন নির্মম শোকের মুখোমুখি হতে না হয়, সে ব্যবস্থা রাষ্ট্রকে গ্রহণ করতে হবে।

আজ সময় এসেছে স্পষ্টভাবে বলার—হাসপাতাল কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি মানুষের জীবনের শেষ আশ্রয়স্থল। সেই আশ্রয়স্থলে অবহেলার কারণে যদি প্রাণ ঝরে যায়, তবে আইনের কঠোর প্রয়োগই হতে হবে ন্যায়বিচারের একমাত্র পথ।

ছয় নবজাতকের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা প্রত্যাশা করি, এই ঘটনা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও মানবিক, আরও নিরাপদ এবং আরও জবাবদিহিমূলক করে তুলবে।

 

একুশে সংবাদ/এ.জে

সর্বোচ্চ পঠিত - মতামত

Link copied!