ব্যাংক বনাম ঋণ খেলাপি—এই প্রচলিত অবস্থার প্রেক্ষিতে দেশের মন্দ ঋণ প্রায় সীমার হার ছাড়িয়ে যখন ঊর্ধ্বগতি, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ পুনর্গঠনে সুদ মওকুফ নীতিমালা বিভিন্ন মহলে আলোচিত ও সমালোচিত। আদতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই বহুল চিন্তিত নীতিমালা, সাধারণ নিয়মের বাইরে এক বিশেষ উদ্যোগ, যা বর্তমান খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনবে বলে আমি মনে করি। যদিও এই সিদ্ধান্তটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত ব্যাংকের ওপর অর্পণ করেছেন, এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে খেলাপি উত্তরণ সম্ভব হবে।
অতীত থেকে বর্তমান এই প্রেক্ষাপটে বিবিধ কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঋণের অপব্যবহার, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, অর্থ পাচার ও সুদের মাত্রা বৃদ্ধি গ্রাহকদের অর্থ সংকট বৃদ্ধি করে খেলাপিতে পরিণত করেছে।
অতীতের সরকার ও তাঁদের ব্যাংকিং খাতের নীতি, বিপুল ব্যাংকিং লাইসেন্স প্রদান, যার ফলে বিপুল ব্যাংকের সমাগম ও অপ্রচলিত ঋণের মাত্রা বৃদ্ধি এবং ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপি হয়ে যাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধির ফলস্বরূপ এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত ইতিবাচক ও তাৎপর্যপূর্ণ।
আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ। দেশের রপ্তানিশিল্প এই নীতির ওপর নির্ভরশীল। তাই আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্য বিদেশি ব্যাংক ও গ্রাহকের ওপর নির্ভরশীল। এলসি খোলার পর থেকে তার কনফার্মেশন ও পরবর্তী রিফাইন্যান্স বা ডিসকাউন্ট এক নিয়মতান্ত্রিক বিষয়। প্রচলিত এই ব্যবস্থায় বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও খেলাপিঋণের মাত্রা হ্রাস দেশের সকল শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের, ব্যাংকের ও গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে সহায়তা করে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা প্রচলিত আইনের বাইরে গিয়ে কার্যকর হবে। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অন্যান্য নীতির সংস্কারও করবেন বলে আশা করছি। বন্ধককৃত সম্পত্তি দ্রুত বিক্রি, যা করে অপ্রদর্শিত অর্থ দিয়ে ক্রয়, দ্রুত অর্থঋণ মামলা নিষ্পত্তি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান ও প্রয়োজনে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের স্বল্প প্রণোদনা, যা এই খেলাপি ঋণ নিরসন করবে, কারণ নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করে পুরোনো খেলাপি ঋণ হ্রাস একটি প্রক্রিয়া। যা দুর্বল ব্যাংকিং কার্যক্রমকে সবল করবে। যদিও ঋণের পরিশোধ ও চলমান মামলা ঋণের বোঝা হ্রাস করবে, কিন্তু ঋণের প্রসার ও ব্যাংকের আয় চলমান রাখতে পারলে আমানতকারীদের সকল নিয়ম মেনে চলতে ব্যাংক সক্ষম হবে।
বর্তমান সরকার ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ, সদ্য সমাপ্ত বাজেট, যা বাস্তবায়ন করতে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার অতি দ্রুত প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি প্রশংসার দাবি রাখে।
আমি বিশ্বাস করি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ও তাঁর সুচিন্তিত পরিকল্পনায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ও জনগণের কল্যাণে উন্নয়ন সাধিত হবে এবং দেশ তার স্বাধীনতার আলোকে উজ্জীবিত থাকবে।
লেখক : অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকার



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

