আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। সেই হিসেবে নির্বাচন ও গণভোটের বাকি আর মাত্র ৩ দিন। প্রচারণার শেষ প্রান্তে এসে প্রার্থী ও তাদের স্ত্রী-সন্তানসহ আত্মীয়-স্বজন, দলের কর্মী-সমর্থকরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। বড় রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিভিন্ন সভা, সমাবেশ ও গণসংযোগের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে নিজেদের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছেন। তবে সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই যেন গরম হচ্ছে নির্বাচনী মাঠ, সরব হচ্ছে চায়ের আড্ডা। সঙ্গে বাড়তি উন্মাদনা যোগাচ্ছে নানান রঙের, নানা ঢংয়ের নির্বাচনী গান নিয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো। এককথায় বলতে গেলে ত্রয়োদশ নির্বাচনে স্ব স্ব দল ও প্রার্থীদের নিয়ে গাওয়া গানে নতুন মাত্রায় জমে উঠেছে প্রচারণা।
এদিকে, ত্রয়োদশ নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই ফিল্টার আর স্লো-মোশন ভিডিও, চমকপ্রদ ছন্দ, সুর আর লিরিকের থিম সং-এ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে ব্যস্ত রাজনৈতিক দলগুলো। প্রথাগত মাইকিং আর পোস্টারিংয়ের গণ্ডি পেরিয়ে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। বাংলার চিরায়ত সৌন্দর্য আর সংস্কৃতির দৃশ্যায়নের পাশাপাশি দলগুলো এখন বেছে নিয়েছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে। এরই মধ্যে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে থিম সং প্রকাশ করেছে, যা প্রকাশের পরপরই তৃণমূল পর্যায়ের জনগণের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে।
এদিকে, ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষে নির্বাচনী গণসংযোগে অংশ নিয়েছেন তার কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। শনিবার দুপুর ১২টার দিকে গুলশানের পুলিশ প্লাজা এলাকা থেকে এ গণসংযোগ শুরু করেন তিনি। গুলশানের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে ঘুরে সাধারণ মানুষের কাছে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চান জাইমা রহমান। এ সময় তিনি পথচারী, রিকশাচালক, সিএনজি চালক, দোকানি, ফুটপাতের বিক্রেতা ও শপিংমলে আসা সাধারণ ভোটারদের হাতে নির্বাচনী লিফলেট বিতরণ করেন। গণসংযোগকালে গুলশান এলাকার বিভিন্ন অফিস ও ব্যাংকেও যান জাইমা রহমান। একটি বেসরকারি ব্যাংকের ভেতরে উপস্থিত ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চান এবং লিফলেট বিতরণ করেন। ভোটারদের উদ্দেশে জাইমা রহমান বলেন, আমি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান। আমার বাবা ঢাকা-১৭ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী। আপনাদের কাছে তার পক্ষে ভোট চাই।
গণসংযোগে লিফলেট ছাড়াও পরিবেশবান্ধব বীজ বিতরণ করতে দেখা যায় জাইমা রহমানকে। এসব বীজ মাটিতে বা টবে রোপণ করলে গাছ জন্মাবে। নির্বাচনী বর্জ্য কমানো ও পরিবেশ রক্ষার লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান জাইমা রহমান। এই গণসংযোগে জাইমা রহমানের সঙ্গে মরহুমা খালেদা জিয়ার পরিচর্যাকারী ফাতেমা খাতুনকেও দেখা যায়। পাশাপাশি নিরাপত্তা সদস্যদের উপস্থিতি থাকলেও জাইমা রহমান সরাসরি সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে ভোট চাইতে মাঠে নামেন। গুলশান পুলিশ প্লাজা থেকে শুরু হয়ে গুলশান-১ সার্কেল পর্যন্ত গণসংযোগ চলাকালে জাইমা রহমানকে ঘিরে উৎসুক জনতার ভিড় দেখা যায়। এ সময় অনেকেই তার সঙ্গে ছবি তুলতে এগিয়ে আসেন, যা তিনি সানন্দে গ্রহণ করেন।
গতকাল শনিবার রাজধানীর কাকরাইলে হক ক্যাসেল ফ্ল্যাট মালিকদের সঙ্গে নির্বাচনী মতবিনিময় সভা শেষে গণসংযোগ করেন ঢাকা-৮ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। তিনি বলেন, আমি শুনেছি সরকারের একটি মহল কয়েকজনের তালিকা করেছে, যাদের পাস করাতে হবে। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলে কারও কারও প্রতি দুর্বলতা দেখা গেছে। তিনি আরও বলেন, কয়েকজন প্রার্থী বলছেন তারা জিতেই গেছেন। আবার সরকারের কেউ কেউ বলছেন তাদের সংসদে যাওয়া উচিত। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হচ্ছে, কিন্তু পক্ষপাতিত্ব হচ্ছে। এটি খারাপ। ভোট পাক বা না পাক, তাদের সংসদে পাঠাবে।
এর আগে সাদেক হোসেন খোকা কমিউনিটি সেন্টারে ঢাকা-৮ আসনে পোলিং এজেন্টদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় অংশ নেন তিনি। রাতে শান্তিনগর ইস্টার্ন পয়েন্ট আবাসিক ১৮০টি ফ্ল্যাট মালিকদের সঙ্গে নির্বাচনী মতবিনিময় সভা করেন মির্জা আব্বাস।
এদিন নির্বাচনী প্রচারের ১৭তম দিনে মিরপুর-১২ ও এর আশপাশের এলাকায় গণসংযোগ করেন ঢাকা-১৬ আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী আমিনুল হক। তিনি বলেন, নির্বাচনী এলাকায় কোনো বহিরাগত ব্যক্তির অবস্থান বা বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না। এ ধরনের যে কোনো পরিস্থিতির দায় সংশ্লিষ্টদেরই নিতে হবে। গণসংযোগকালে আমিনুল হক এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে তার ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। এ সময় স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
একই দিন সকালে পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ায় ধুপখোলা মাঠে ঢাকা-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী ইশরাক হোসেনের নির্বাচনী জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় তার পক্ষে ভোট চেয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন খতমে নবুওয়ত সংরক্ষণ কমিটি বাংলাদেশের আমির মাওলানা আব্দুল হামিদ পীর সাহেব মধুপুর। ইশরাককে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, এই ছেলেকে দিয়ে কাজ হবে।
ঢাকা-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী আলহাজ নবী উল্লাহ নবীকে বিজয়ী করতে মাঠে নেমেছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। শনিবার বিকেলে ৬৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাঠেরপুল, কোনাপাড়া-শাহজালাল রোড, দরবার শরিফসহ আশপাশের এলাকায় গণসংযোগ করেন সাবেক মাতুয়াইল ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মো. জাকির হোসেন জিকু। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ডিএসসিসির ৬৪ নম্বর ওয়ার্ডে গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণ করেন। তিনি লিফলেট বিতরণকালে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট চান।
একই দিন ঢাকা-৫ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মীর আব্দুস সবুর আসুদ যাত্রাবাড়ি থানাধীন কুতুবখালী ও কাজলাসহ বিভিন্ন স্থানে গণসংযোগ ও প্রচারণা চালান। এ সময় তিনি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দোয়া কামনা করেন এবং লাঙ্গল প্রতীকে ভোট প্রার্থনা করেন। গণসংযোগকালে মীর আব্দুস সবুর আসুদ প্রয়াত এরশাদ সরকারের আমলের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড তুলে ধরে ভোটারদের মাঝে লিফলেট বিতরণ করেন। তিনি বলেন, আমি ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছি এবং ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। পল্লীবন্ধু এরশাদ সাহেবের উন্নয়নের কথা মানুষ এখনো স্মরণ করে। তার প্রতিষ্ঠিত দলের প্রতীক লাঙ্গল খেটে খাওয়া মানুষের কথা বলে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। সেই লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে আমি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছি। সকলের কাছে দোয়া ও ভোট প্রার্থনা করছি। এ সময় স্থানীয় জাতীয় পার্টি ও জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক পার্টিসহ দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
শনিবার বিকেলে যাত্রাবাড়ী থানার ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডে গণসংযোগ করেন ১১ দলীয় জোট সমর্থিত দাড়িপাল্লার প্রার্থী মোহাম্মদ কামাল হোসেন। এ সময় তিনি ভোটারদের নানা প্রতিশ্রুতি দেন এবং দাড়িপাল্লা মার্কায় ভোট চান।
ঢাকা-১৫ আসনে দাড়িপাল্লার মিছিলে নারীদের ঢল: রাজধানীর মিরপুরে ঢাকা-১৫ আসনে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সমর্থনে দাড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে মাঠে নেমেছেন হাজার হাজার নারী কর্মী। শনিবার সকাল ১০টায় রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর গোল চত্বরে হাজার হাজার নারী কর্মী জড়ো হন। সেখানে নারী সমাবেশে বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ইরানী আক্তার। আল কোরআনের আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, তোমরা উত্তম জাতি। আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি মানুষের কল্যাণ সাধনের জন্য। এখানে মানুষের কল্যাণ দুইভাবে করতে হবে। এই পৃথিবীর জীবনকে নিরাপদ করার মাধ্যমে একটি কল্যাণ করা যায়। আর ন্যায় ও ইনসাফপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পৃথিবীর কল্যাণ হতে পারে। আমরা আশা করছি এখানের প্রার্থী ডা. শফিকুর রহমান সাহেব সেই কল্যাণমূলক কাজ করে আমাদের সমাজের যত অকল্যাণ রয়েছে তা দূর করবেন।
তিনি বলেন, আমরা আশা করি একটি মানবিক কল্যাণমূলক সমাজ পাব। সে লক্ষ্যে আজ আমরা এখানে জড়ো হয়েছি। আমরা নারী সমাজকে এই বার্তাটি দিতে চাই—নারীমুক্তি, নারীর নিরাপত্তা ও নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা হতে পারে ন্যায় ও ইনসাফপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। আমরা সকল নারী ভোটারসহ সকল শ্রেণির ভোটারকে আহ্বান জানাব ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে ভোট দিয়ে একটি মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে, যাতে দুনিয়ায় সুন্দর একটি জান্নাতি পরিবেশ গড়ে ওঠে।
সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে কয়েক হাজার নারী কর্মীর একটি মিছিল মিরপুর-১০ নম্বর গোল চত্বর হয়ে কাজীপাড়া মেট্রোরেল স্টেশন পার হয়ে শেষ হয়। মিছিলের অগ্রভাগে নেতৃত্ব দেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসাইন।
প্রসঙ্গত, গত ২২ জানুয়ারি থেকে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছেন। আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত এই প্রচারণা চালাতে পারবেন।
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

