নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে আর মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকলেও মাধ্যমিক স্তরের বিপুলসংখ্যক পাঠ্যবই এখনো ছাপা হয়নি। এর ফলে ১ জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই পৌঁছানো নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মাধ্যমিক পর্যায়ের সাড়ে ১১ কোটির বেশি বই এখনো মুদ্রণের বাইরে থাকায় ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির এক কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী বছরের প্রথম দিনে বইবিহীন অবস্থায় ক্লাসে বসতে বাধ্য হবে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্র জানায়, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে মোট প্রায় ৩০ কোটি বই ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ২১ কোটি ৪৩ লাখের বেশি বই মাধ্যমিক স্তরের। প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি স্তরের অধিকাংশ বই ছাপা ও সরবরাহ সম্পন্ন হলেও মাধ্যমিক স্তরের বই নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। বছর শেষ হয়ে গেলেও মাধ্যমিকের সাড়ে ১১ কোটির বেশি বই এখনো ছাপা হয়নি।
এনসিটিবির কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, অষ্টম শ্রেণির বইয়ের অবস্থা সবচেয়ে উদ্বেগজনক। এই শ্রেণির জন্য নির্ধারিত ৪ কোটির বেশি বইয়ের বিপরীতে ছাপা হয়েছে মাত্র প্রায় ১৮ লাখ, যা মোট চাহিদার পাঁচ শতাংশেরও কম। সপ্তম শ্রেণির প্রায় ৪ কোটি ১৫ লাখ বইয়ের মধ্যে ছাপা হয়েছে প্রায় ৭০ লাখ। ষষ্ঠ ও নবম শ্রেণির অবস্থা তুলনামূলক কিছুটা ভালো হলেও সেখানেও বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।
বই ছাপায় বিলম্বের পেছনে এনসিটিবির ভেতরে একটি প্রভাবশালী চক্র কাজ করছে—এমন অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্ট প্রেস মালিক ও কর্মকর্তাদের একটি অংশ। তাদের দাবি, এনসিটিবির একজন সদস্যের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রেস ও পেপার মিলকে সুবিধা দিতে গিয়ে পুরো প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিয়েছে। পছন্দের বাইরে থাকা মিল থেকে কাগজ কিনলে তা বাতিল করানোর অভিযোগও উঠেছে।
সূত্র জানায়, চলতি বছরের মে মাসে দরপত্র আহ্বান করা হলেও পরে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট একাধিক প্রেস কাজ পাওয়ায় অভিযোগ ওঠে। এর জেরে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির কয়েক শ কোটি টাকার দরপত্র স্থগিত করে। পরবর্তীতে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হলেও সেখানে আবারও নির্দিষ্ট দুটি প্রেসকে অস্বাভাবিক কম দরে বড় অংশের কাজ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
এ পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে অন্যান্য প্রেস আরও কম দরে কাজ নিতে বাধ্য হয়। এতে লোকসান সামাল দিতে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন প্রেস মালিকরা।
আরও অভিযোগ রয়েছে, শুরুতে কঠোর কাগজের মানদণ্ড নির্ধারণ করা হলেও পরে হঠাৎ করে তা শিথিল করা হয়। একই শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও নবম শ্রেণির বই আগের মানেই ছাপা হলেও ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির ক্ষেত্রে মান কমানোর সিদ্ধান্ত প্রশ্ন তুলেছে স্বচ্ছতা নিয়ে।
এনসিটিবির সদস্য ড. রিয়াদ চৌধুরী অবশ্য দাবি করেছেন, সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করেই কাগজের মান নির্ধারণ ও পরে কিছুটা শিথিল করা হয়েছে। তার ভাষ্য, নির্ধারিত মান অনুযায়ী কাগজ সরবরাহে সমস্যা হওয়ায় বাস্তবতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রেস মালিকদের দাবি—মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপাতে প্রয়োজনীয় বিপুল পরিমাণ কাগজ সরবরাহে মাত্র কয়েকটি মিলকে অনুমোদন দিয়ে কমিশন বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, শুধু মাধ্যমিক পর্যায়ের বই ছাপাতেই কয়েক দশ কোটি টাকার কমিশন লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বলেন, দরপত্র সংক্রান্ত জটিলতার কারণে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির বইয়ে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। তবে অন্য শ্রেণির বই সময়মতো পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে।
এদিকে, এনসিটিবির সচিব মো. সাহতাব উদ্দিন কাগজ সিন্ডিকেটের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বিষয়টি আরও যাচাই করে দেখা প্রয়োজন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, বই সংকটের কারণে শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই বড় ধরনের শিক্ষা বিঘ্ন ঘটবে। শিক্ষার্থীদের হাতে সব বই পৌঁছাতে মার্চ মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

