AB Bank
  • ঢাকা
  • শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬,

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad QR Code
BBS Cables
Janata Bank
  1. জাতীয়
  2. রাজনীতি
  3. সারাবাংলা
  4. আন্তর্জাতিক
  5. অর্থ-বাণিজ্য
  6. খেলাধুলা
  7. বিনোদন
  8. শিক্ষা
  9. তথ্য-প্রযুক্তি
  10. অপরাধ
  11. প্রবাস
  12. রাজধানী

৫ হাজার বছরেও অমীমাংসিত পিরামিডের রহস্য


Ekushey Sangbad
ফিচার ডেস্ক
০৮:০৮ পিএম, ১১ জুলাই, ২০২৬

৫ হাজার বছরেও অমীমাংসিত পিরামিডের রহস্য

মিশরের নাম উচ্চারিত হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পিরামিড, ফারাও, ক্লিওপেট্রা, মমি, বিস্তীর্ণ মরুভূমি এবং হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতার গৌরবময় ইতিহাস।

বিশেষ করে প্রাচীন মিশরকে ঘিরে মানুষের কৌতূহল আজও অম্লান। ফারাওদের জীবন, মমির রহস্য ও পিরামিডের নির্মাণকৌশল যুগের পর যুগ ধরে গবেষক ও ইতিহাসবিদদের বিস্মিত করে আসছে।

মরুভূমির বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পিরামিডগুলো দূর থেকে দেখলে যেন বিশাল পাথরের পাহাড়। তবে কাছে গেলেই স্পষ্ট হয়, এগুলো মানুষের হাতেই নির্মিত এক অনন্য স্থাপত্য বিস্ময়। হাজার হাজার বছর ধরে সূর্যের তাপ, ঝড়, বালুঝড় ও সময়ের নিরন্তর আঘাত সহ্য করেও পিরামিডগুলো আজও অটুট রয়েছে। পৃথিবীর প্রাচীন সাত আশ্চর্যের মধ্যে একমাত্র টিকে থাকা এই স্থাপত্য শুধু রাজকীয় সমাধি নয়, মানবসভ্যতার প্রকৌশল দক্ষতা ও রহস্যময় ইতিহাসের এক অনন্য নিদর্শন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গিজা মালভূমির তিনটি বিখ্যাত পিরামিড নির্মিত হয়েছিল প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ও বিখ্যাত হলো ফারাও খুফুর পিরামিড। নির্মাণের সময় এর উচ্চতা ছিল প্রায় ১৪৬ মিটার। আধুনিক প্রযুক্তি বা ভারী যন্ত্রপাতি ছাড়াই এত বিশাল পাথরের কাঠামো কীভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল, সে প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর আজও মেলেনি। এ কারণেই পিরামিডকে ঘিরে রহস্য ও গবেষণার আগ্রহ কখনো কমেনি।

প্রাচীন মিশরীয়দের বিশ্বাস ছিল, মৃত্যু জীবনের শেষ নয়; বরং আরেকটি জীবনের সূচনা। এই বিশ্বাস থেকেই মৃত্যুর পর ফারাওদের জন্য নির্মাণ করা হতো বিশালাকার সমাধি, যাতে পরকালেও তারা রাজকীয় জীবনযাপন করতে পারেন। ফারাওদের মরদেহ বিশেষ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করা হতো, যা বর্তমানে ‘মমি’ নামে পরিচিত। এ প্রক্রিয়ায় দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ অপসারণ করে ন্যাট্রন লবণ ও অন্যান্য সংরক্ষণকারী উপাদানের সাহায্যে দেহ দীর্ঘদিন অক্ষত রাখা হতো। পরে সূক্ষ্ম কাপড়ে স্তরে স্তরে জড়িয়ে মূল্যবান কফিনে সংরক্ষণ করা হতো সেই মমি।

মমিকরণও প্রাচীন মিশরের অন্যতম বিস্ময়কর রহস্য। প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে কীভাবে মিশরীয়রা এত উন্নত দেহ সংরক্ষণের কৌশল উদ্ভাবন করেছিলেন, তার পূর্ণাঙ্গ উত্তর আজও খুঁজে পাননি গবেষকরা। আধুনিক বিজ্ঞান এ বিষয়ে অনেক তথ্য উদ্ঘাটন করলেও এই প্রক্রিয়ার সূচনা ও বিকাশ এখনো নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।

প্রাচীন মিশরীয়দের বিশ্বাস ছিল, মৃত্যুর পরও মানুষের আরেকটি জীবন রয়েছে। তাই পরকালেও যেন ফারাওরা রাজকীয় জীবনযাপন করতে পারেন, সে উদ্দেশ্যে তাদের মমির পাশে রাখা হতো প্রয়োজনীয় নানা সামগ্রী। এর মধ্যে থাকত খাদ্য, পোশাক, অস্ত্র, অলংকার, আসবাবপত্র, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে পোষা প্রাণীর মমিকৃত দেহও। তাদের ধারণা ছিল, পরবর্তী জীবনেও এসব জিনিসের প্রয়োজন হবে এবং এগুলো মৃত রাজাকে সঙ্গ দেবে।


পিরামিডের ভেতরে আসলে কী রয়েছে
বাইরে থেকে পিরামিডকে যতটা সরল মনে হয়, ভেতরের কাঠামো ততটাই জটিল। সরু করিডর, গোপন পথ, বাতাস চলাচলের জন্য তৈরি শ্যাফট এবং একাধিক কক্ষ নিয়ে নির্মিত হয়েছিল এসব সমাধি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি ছিল ‘কিংস চেম্বার’, যেখানে রাখা হতো ফারাওয়ের সারকোফাগাস বা পাথরের কফিন। কিছু পিরামিডে ‘কুইন্স চেম্বার’ ও অন্যান্য গোপন কক্ষও রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখনো নতুন নতুন ফাঁপা কক্ষ বা অজানা স্থান শনাক্ত হচ্ছে, যা এই রহস্যকে আরও গভীর করেছে।

কিন্তু কীভাবে তৈরি হয়েছিল এই বিস্ময়?
পিরামিড নির্মাণের সবচেয়ে বড় রহস্য হলো এর নির্মাণপ্রক্রিয়া। প্রতিটি পাথরের ওজন ছিল গড়ে ২ থেকে ১৫ টন, আর কিছু গ্রানাইট ব্লকের ওজন ৭০ টনেরও বেশি। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, হাজার হাজার দক্ষ শ্রমিক দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে র‍্যাম্প তৈরি করে ধীরে ধীরে এসব পাথর উপরে তুলেছিলেন। একসময় মনে করা হতো, এসব নির্মাণে কেবল দাসদের ব্যবহার করা হয়েছিল।

তবে সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় শ্রমিকদের আবাসন, খাদ্য ও চিকিৎসার প্রমাণ মিলেছে, যা থেকে ধারণা করা হয় তারা ছিলেন প্রশিক্ষিত ও পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত কর্মী। তবু প্রশ্ন থেকেই যায় এত নিখুঁতভাবে কোটি কোটি পাথর বসানো হয়েছিল কীভাবে? আধুনিক প্রকৌশলীরাও এই নিখুঁততা দেখে বিস্মিত হন।


পিরামিডের যত রহস্য, মিথ আর অভিশাপ
পিরামিডকে ঘিরে অসংখ্য কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো ‘ফারাওয়ের অভিশাপ’। বিশ্বাস করা হয়, যারা সমাধি লুট করেন বা অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করেন, তাদের ওপর নেমে আসে অমঙ্গল।

বিশেষ করে ১৯২২ সালে রাজা টুটানখামেনের সমাধি আবিষ্কারের পর অভিযানে জড়িত কয়েকজনের অস্বাভাবিক মৃত্যু এই কিংবদন্তিকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। যদিও বিজ্ঞানীরা এসব ঘটনার পেছনে প্রাকৃতিক কারণ, ব্যাকটেরিয়া বা কাকতালীয় ঘটনাকেই বেশি গুরুত্ব দেন।

পিরামিড ভিনগ্রহের প্রাণীদের তৈরি!
আবার অনেকে দাবি করেন, ভিনগ্রহের প্রাণীরা নাকি পিরামিড নির্মাণে সাহায্য করেছিল। কিন্তু এমন দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিছু মানুষ প্রাচীন মিশরের দেয়ালচিত্র বা হায়ারোগ্লিফে এমন কিছু আকৃতি দেখিয়ে দাবি করেন, সেগুলো নাকি মহাকাশযান বা এলিয়েনের ছবি। তবে প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, এগুলো ধর্মীয় প্রতীক, দেব-দেবীর চিত্র বা শিল্পরীতির অংশ; এলিয়েনের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্কের প্রমাণ নেই।

গিজার মহান পিরামিডে প্রায় ২৩ লাখেরও বেশি পাথরের ব্লক ব্যবহার করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। অনেক ব্লকের ওজন ২–১৫ টন, আর কিছু গ্রানাইট ব্লকের ওজন ৫০-৮০ টনের কাছাকাছি। এত ভারী পাথর হাজার হাজার বছর আগে কীভাবে সরানো হয়েছিল, এই প্রশ্ন থেকেই এলিয়েন তত্ত্ব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

পিরামিড চার দিকের (উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম) সঙ্গে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সামঞ্জস্য রেখে নির্মিত। অনেকের দাবি, এত নিখুঁত পরিমাপ তখনকার মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তবে আধুনিক গবেষণা বলছে, প্রাচীন মিশরীয়রা জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জরিপবিদ্যায় অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন।

কিছু মানুষ প্রাচীন মিশরের দেয়ালচিত্র বা হায়ারোগ্লিফে এমন কিছু আকৃতি দেখিয়ে দাবি করেন, সেগুলো নাকি মহাকাশযান বা এলিয়েনের ছবি। তবে প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, এগুলো ধর্মীয় প্রতীক, দেব-দেবীর চিত্র বা শিল্পরীতির অংশ; এলিয়েনের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্কের প্রমাণ নেই।

তবে সুইস লেখক এরিখ ভন ড্যানিকেন ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত তার বই ‘চ্যারোটিকস অব দ্য গডস’-এ দাবি করেন, প্রাচীন পৃথিবীর অনেক স্থাপনা, বিশেষ করে মিশরের পিরামিড, ভিনগ্রহের প্রাণীদের সহায়তায় নির্মিত হতে পারে। পরে বিভিন্ন টিভি অনুষ্ঠান, বিশেষ করে অ্যান্সাইন্ট অ্যালাইন্স এই ধারণাকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।

পিরামিড শুধু সমাধি নয়, জ্ঞানেরও প্রতীক
গবেষকদের মতে, পিরামিড নির্মাণে গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়। চারটি দিককে প্রায় নিখুঁতভাবে উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমের সঙ্গে মিলিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল গিজার পিরামিড। সূর্যের অবস্থান, নক্ষত্রের গতিপথ এবং ঋতু পরিবর্তনের বিষয়েও প্রাচীন মিশরীয়দের গভীর জ্ঞান ছিল বলে ধারণা করা হয়।

আজও বিজ্ঞানীরা লেজার স্ক্যানিং, কসমিক-রে ইমেজিং এবং থ্রিডি প্রযুক্তির সাহায্যে পিরামিডের অজানা অংশ অনুসন্ধান করছেন। প্রায় প্রতি কয়েক বছর পরপরই নতুন কোনো তথ্য বা গোপন কক্ষের ইঙ্গিত মিলছে।

পিরামিড রহস্যের আকর্ষণ আজও অমলিন
পৃথিবীতে অসংখ্য স্থাপত্য রয়েছে, কিন্তু খুব কম নির্মাণই মানুষের কৌতূহলকে এত দীর্ঘ সময় ধরে ধরে রাখতে পেরেছে। পিরামিড শুধু প্রাচীন মিশরের রাজাদের সমাধি নয়; এটি মানুষের মেধা, বিশ্বাস, প্রযুক্তি ও সভ্যতার এক অমূল্য দলিল।

হাজার বছরের গবেষণার পরও এর সব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। কীভাবে এত বিশাল স্থাপনা তৈরি হয়েছিল, সব গোপন কক্ষ কি আবিষ্কৃত হয়েছে, নাকি এখনো মরুভূমির বালুর নিচে লুকিয়ে আছে আরও অজানা ইতিহাস এসব প্রশ্নই পিরামিডকে আজও বিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় স্থাপত্যগুলোর একটি করে রেখেছে।

আর হয়তো এই অমীমাংসিত রহস্যই প্রতি বছর লাখো মানুষকে টেনে নিয়ে যায় মিশরের মরুভূমিতে, ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর সৃষ্টি নিজের চোখে দেখার জন্য। সূত্র: হিস্টোরি ডটকম, অ্যান্সাইন্ট অরিজিন

 

একুশে সংবাদ/ওজি

Link copied!