# চলতি মৌসুমে ২২ হাজার ৭৭৪ মেট্রিক টন আনারস উৎপাদন, বাজারমূল্য প্রায় ৬৮ কোটি ৩২ লাখ ২০ হাজার টাকা
চায়ের রাজ্যখ্যাত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলসহ বিভিন্ন উপজেলায় উঁচু-নিচু পাহাড়ি টিলার গা ঘেঁষে প্রতি বছরই রসালো ফল আনারসের চাষাবাদ বাড়ছে। অনুকূল আবহাওয়া, উর্বর মাটি এবং কৃষকদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে এখানকার আনারস স্বাদ, গন্ধ ও গুণগত মানে দেশের অন্য সব অঞ্চলের চেয়ে আলাদা পরিচিতি পেয়েছে। এবার সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফিলিপাইন থেকে আমদানিকৃত উচ্চফলনশীল এমডি-২ জাতের আনারস, যা স্থানীয় কৃষকদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, সিলেট অঞ্চলে ১৯৫০ সাল থেকেই সীমিত পরিসরে আনারস চাষ শুরু হলেও শ্রীমঙ্গলে বাণিজ্যিকভাবে আনারসের চাষাবাদ শুরু হয় ষাটের দশকে। পাহাড়ি ছনখলা কেটে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে আনারসের বাগান। বর্তমানে শ্রীমঙ্গল দেশের আনারস উৎপাদনের রাজধানী হিসেবে পরিচিত। এখানকার জলচুপি বা হানিকুইন জাতের আনারস দেশজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয় এবং একসময় বিদেশেও রপ্তানি হতো।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, রাজনগর, কুলাউড়া ও বড়লেখার পাহাড়ি টিলায় মোট ১ হাজার ২২৩ হেক্টর জমিতে আনারসের চাষ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এমডি, হানিকুইন ও জায়েন্ট কিউ জাতের প্রায় ২২ হাজার ৭৭৪ মেট্রিক টন আনারস উৎপাদন হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৬৮ কোটি ৩২ লাখ ২০ হাজার টাকা।
এর মধ্যে চলতি মৌসুমে শুধু শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ৪২৫ হেক্টর জমিতে হানিকুইন, জায়ান্ট কিউ এবং এমডি-২ জাতের আনারসের চাষ হয়েছে। এসব বাগান থেকে মোট ৬ হাজার ৮২১ মেট্রিক টন আনারস উৎপাদিত হয়েছে, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ১২ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
উপজেলার আশিদ্রোন ইউনিয়নের রাধানগর, ডলুছড়া, মহাজিরাবাদ, বালিশিরা, সাতগাঁও, রাজঘাট, কালিঘাট ও মির্জাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিস্তীর্ণ পাহাড়ি টিলাজুড়ে আনারসের বাগান দেখা যায়। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পাইকাররা প্রতিদিন ট্রাক ও পিকআপভর্তি আনারস কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
ডলুছড়া গ্রামের কৃষক আতর আলী জানান, তিনি ২২ শতাংশ জমিতে ২ হাজার ২৫০টি এমডি-২ আনারসের চারা রোপণ করেছেন। ইতোমধ্যে তিনি প্রায় এক লাখ টাকার আনারস বিক্রি করেছেন। তার মতে, এমডি-২ জাতের আনারস দেশীয় আনারসের তুলনায় অনেক বেশি সুস্বাদু এবং সংরক্ষণযোগ্য। এটি পাকার পর ১০ থেকে ১৫ দিন ভালো থাকে এবং এক মাসেরও বেশি সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব।
মহাজিরাবাদ গ্রামের কৃষক শফিক মিয়া জানান, তিনি ৩০ শতাংশ জমিতে ২ হাজার ৫০০টি এমডি-২ আনারস চাষ করেছেন। ফলন ভালো হওয়ায় তিনি লাভবান হওয়ার আশা করছেন।
স্থানীয় কৃষি বিভাগ জানায়, মৌলভীবাজারসহ টাঙ্গাইল, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলায় প্রথম ফিলিপাইনের এমডি-২ জাতের আনারস পরীক্ষামূলক চাষ করা হয়। এসব জেলার ৩৮০ জন চাষিকে চাষ ২ হাজার ২৫০টি করে ফিলিপাইনের এমডি-২ জাতের চারা বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছিল। সব জেলায় পরীক্ষামূলক চাষ সফল হয়েছে। তবে সাত জেলার উৎপাদিত আনারসের মধ্যে শ্রীমঙ্গলে উৎপাদিত আনারস গুণে, মানে ও স্বাদে অনন্য হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল কৃষি অধিদপ্তরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুকুর রহমান বলেন, শ্রীমঙ্গলে আনারস বাগান বেশ বিখ্যাত এবং এই অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ। এখানকার আনারস বাগান তার স্বাদ ও মানের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। সম্প্রতি ফিলিপাইন থেকে আনা এমডি-২ জাতের আনারসের চারাগুলো উপজেলার নির্দিষ্ট কিছু বাগানে পরীক্ষামুলকভাবে রোপণ করা হয়। শুরু থেকেই চারাগুলোর বৃদ্ধি স্বাভাবিক ছিল। গাছে ফল আসে নির্ধারিত সময়েই। ফলের আকৃতি, রং, স্বাদ সবই আনন্তর্জাতিক মানের।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন বলেন, আমাদের এলাকার মাটি এই জাতের আনারস চাষের জন্য উপযোগী। এমডি-২ জাতের আনারসের ফলন দেখে আগামীতে আমরা ব্যাপকহারে চাষে যাওয়ার কথা ভাবছি। এই জাতটি স্থানীয় জাতের তুলনায় অধিক ফলনশীল ও রসালো। ফলে বাজারমূল্যও ভালো পাওয়া যাচ্ছে। স্থানীয় কৃষি অফিস জানায়, এমডি-২ আনারস হেক্টর প্রতি উৎপাদন হয় ১৫ থেকে ১৬ টন। এই জাতের আনারস বিশ্বজুড়ে গোল্ডেন সুইট বা এক্সট্রা সুইট পাইনআপেল নামে পরিচিতি। ফিলিপাইন, কোস্টারিকা, থাইল্যান্ডের মতো দেশে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয়। এই আনারস শুধু স্বাদে নয়, পুষ্টিতেও সমৃদ্ধ।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. জালাল উদ্দিন জানান, মৌলভীবাজার জেলার আনারস স্বাদ, গন্ধ ও গুণগত মানে দেশের অন্য সব অঞ্চলের চেয়ে আলাদা পরিচিতি পেয়েছে। বিশেষ করে এমডি-২ জাতের আনারস বিশ্বজুড়ে ‘গোল্ডেন সুইট’ নামে পরিচিত।
এটি স্বাদে মিষ্টি, পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদাসম্পন্ন। এই জাতের আনারসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি সহজে নষ্ট হয় না, দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় এবং রফতানিযোগ্য মান বজায় থাকে। ফলে ভবিষ্যতে এই জাতের আনারস রপ্তানির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার সম্ভাবনা রয়েছে।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

