AB Bank
  • ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২৬,

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad QR Code
BBS Cables
Janata Bank
  1. জাতীয়
  2. রাজনীতি
  3. সারাবাংলা
  4. আন্তর্জাতিক
  5. অর্থ-বাণিজ্য
  6. খেলাধুলা
  7. বিনোদন
  8. শিক্ষা
  9. তথ্য-প্রযুক্তি
  10. অপরাধ
  11. প্রবাস
  12. রাজধানী

নামহীন কবর, শেষ ঠিকানার খোঁজে এক নারীর বেদনা


Ekushey Sangbad
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১২:৩৯ এএম, ২৯ মে, ২০২৬

নামহীন কবর, শেষ ঠিকানার খোঁজে এক নারীর বেদনা

গাজা উপত্যকায় একটি নামহীন কবরের পাশে লিনা আল-আসি চুপচাপ বসে আছেন। তিনি ফুল ছিঁড়ে মাটিতে জল ঢালেন, এই বিশ্বাসে যে তাঁর স্বামী সেখানেই শায়িত আছেন। তাঁর সবচেয়ে কাছের সঙ্গী ছিলেন জিহাদ তাফেশ, যিনি ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে নিখোঁজ।

লিনা নিয়মিত কবরস্থানটিতে যান। গাজা জুড়ে এখন এই ধরনের প্রায় ১,২০০টি সমাধিস্থল রয়েছে, যেখানে অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদেহ এবং পরিচয় অজানা থাকা নিখোঁজ ব্যক্তিদের দাফন করা হয়েছে।

২৬ বছর বয়সী এই দুই সন্তানের মা তার স্বামীর সঙ্গে ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর অর্থাৎ যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনেই যোগাযোগ হারান। তখন ইসরায়েলি বিমান হামলা চলছিল। ওই সময় ২৮ বছর বয়সী জিহাদ গাজা সিটির শুজাইয়া এলাকায় নিজের বাড়িতে বাবা-মায়ের সঙ্গে থেকে যান, আর লিনা সন্তানদের নিয়ে পালিয়ে যান।

যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপদ আশ্রয় থাকবে না, আগামী দিন মুসলিম উম্মাহর: মোজতবা খামেনি 
লিনা বলেন, ‘বোমাবর্ষণ চারদিকে হচ্ছিল, আমাদের এলাকা ছিল খুবই বিপজ্জনক এবং সীমান্তের কাছে।’ সেদিন থেকেই তিনি স্বামীকে খুঁজতে থাকেন, কিন্তু কোনো সন্ধান পাননি। ফিলিস্তিনি এই নারী বলেন, ‘আমরা রেড ক্রসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম, কিন্তু কোনো ফল পাইনি। আমরা জানতাম না তিনি আটক, আহত, নাকি নিহত।’

‘এক ভিন্ন ধরনের যন্ত্রণা’
যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি এবং দুই সন্তানকে একা লালন-পালনের মধ্যেও লিনা বেঁচে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তার দুই সন্তান—হানা (৫) ও জুরি (৪) এখন তার পুরো পৃথিবী। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর লিনা আবার স্বামীর খোঁজে পুরোপুরি মনোযোগ দেন। ওই সময় থেকে ইসরায়েল রেড ক্রসের মাধ্যমে গাজায় ফিলিস্তিনিদের মরদেহ ফেরত দিতে শুরু করে।

এরপর খান ইউনিসের নাসের মেডিকেল কমপ্লেক্সে দফায় দফায় মরদেহ আনা হয়, যেখানে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত ২৮৫টি মরদেহ পৌঁছায়। কিন্তু এসব মরদেহের পরিচয় ছিল অধিকাংশই অজানা। কিছু দেহের সঙ্গে পরিচয়পত্র ছিল, আবার কিছুতে শুধু নম্বর লেখা ছিল। পরিবারগুলো পোশাক, শরীরের চিহ্ন বা ব্যক্তিগত জিনিস দেখে শনাক্ত করার চেষ্টা করছিল।

লিনা হাসপাতালেও যান পরিচয় শনাক্তের জন্য। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি ছবি দেখার সময় আমি প্রার্থনা করতাম যেন তিনি সেখানে না থাকেন। অনেক মরদেহ ভয়াবহভাবে বিকৃত ছিল, কিছুতে নির্যাতনের চিহ্ন ছিল, কিছু আবার পচনের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল।’ তিনি বলেন, ‘এটা এক ভিন্ন ধরনের যন্ত্রণা… যখন আপনি আপনার প্রিয় মানুষকে এমন অবস্থায় দেখেন।’

প্রিয়জনকে খুঁজে পেতে লিনা দুই সপ্তাহের বেশি সময় হাসপাতালে আসা-যাওয়া করেন। এক পর্যায়ে তিনি একটি মরদেহকে তার স্বামীর মতো মনে করেন, কিন্তু নিশ্চিত হতে পারেননি। পরে তিনি যখন ফিরে আসেন, তখন জানতে পারেন- ওই মরদেহ ইতোমধ্যে দাফন করা হয়েছে।
‘নিখোঁজদের কবরস্থান’
২০২৫ সালের অক্টোবরে দেইর আল-বালাহ কবরস্থান প্রতিষ্ঠিত হয়, যা স্থানীয়ভাবে ‘নিখোঁজদের কবরস্থান’ বা ‘নম্বরযুক্ত কবরস্থান’ নামে পরিচিত। গাজার ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কবরস্থান বিভাগের প্রধান জিয়াদ ওবায়েদ জানান, গাজা সিটি ও উত্তর গাজার অনেক কবরস্থান বন্ধ বা অপ্রবেশযোগ্য হয়ে যাওয়ায় এই নতুন কবরস্থান তৈরি করা হয়।

তার মতে, এখানে আনা মরদেহগুলো বিভিন্ন জায়গা থেকে আসে, বিশেষ করে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার হওয়া, রাস্তায় পাওয়া, হাসপাতাল বা স্কুল প্রাঙ্গণে অস্থায়ীভাবে দাফন করা লাশ, এমনকি রেড ক্রসের মাধ্যমে বিনিময় করা মরদেহও রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু সংখ্যায় নয়, মরদেহের অবস্থায়ও। অনেক মরদেহ এতটাই পচে যাওয়া অবস্থায় বা বিকৃত হওয়া অবস্থায় এখানে আসে, যা শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।’ ইসরায়েল কিছু ক্ষেত্রে মরদেহের সঙ্গে ডিএনএ কোড পাঠালেও গাজায় কার্যকর ল্যাব না থাকায় তা বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ বিষয়ে ওবায়েদ বলেন, ‘গত দেড় বছর ধরে ডিএনএ সুবিধা চালু করা বা বিদেশে নমুনা পাঠানোর জন্য বারবার আহ্বান জানানো সত্ত্বেও কোনো অগ্রগতি হয়নি।’

জটিল শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া
নিয়ম অনুযায়ী, রেড ক্রস থেকে মরদেহ হাসপাতালগুলোতে পাঠানো হয়। সেখানে ফরেনসিক দল ছবি তোলে, নমুনা সংগ্রহ করে এবং ব্যক্তিগত জিনিস সংরক্ষণ করে। এরপর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা ধর্ম মন্ত্রণালয় প্রতিটি মৃতদেহকে একটি অনন্য কোড প্রদান করে। প্রতিটি মরদেহকেই একটি করে আলাদা কোড দেয়া হয়। এরপর ৬ থেকে ১০ দিন হাসপাতালের নির্দিষ্ট কক্ষে রাখা হয় যাতে পরিবারগুলো শনাক্ত করতে পারে। না হলে দাফন করা হয় কবরস্থানে। তবুও শনাক্তকরণ খুবই সীমিত, ফলে অজ্ঞাত মরদেহের সংখ্যা বাড়ছে।

ওবায়েদ বলেন, ‘সম্পূর্ণ মানবদেহের পরিবর্তে দেহের আংশিক অংশ পাঠাচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ডিএনএ পরীক্ষার সুবিধা না থাকায় এই সংকট মানবিক ও মানসিকভাবে পরিবারগুলোর ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে যারা প্রিয়জনের শেষ চিহ্নটুকু পেতে বড় আশা নিয়ে গভীর শোকের মধ্যে রয়েছেন।’

আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ হারবার্ট মুশুম্বা বলেন, ‘গাজায় এখন কোনো ডিএনএ পরীক্ষাগার নেই। তাই নমুনাগুলো সংরক্ষণ করে ভবিষ্যতের পরীক্ষার জন্য রাখা হচ্ছে।’ মুশুম্বা আরও বলেন, ‘েযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সংস্থাটির সহায়তায় দেইর আল-বালাহ কবরস্থানটি খোলা হয়েছিল এবং গত বছর থেকে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে।

বর্তমানে প্রায় ১,৪০০টি কবর রয়েছে এখানে, যার মধ্যে প্রায় ৩৫০টি এখনও অব্যবহৃত। দুই সন্তানের জননী লিনার প্রিয়জনের শেষ ঠিকানাটুকু নিশ্চিত হওয়ার জন্য এই কবরস্থানই এখন একমাত্র ভরসা।

তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো- যখন প্রিয়জনকে নামহীনভাবে, শুধু একটি নম্বর দিয়ে দাফন করা হয়। এটি এমন এক গভীর যন্ত্রণা যা এখনও আমার হৃদয়ে রয়ে গেছে। আমি শুধু চাই আমার স্বামীর নম্বর নয়, একটি নামযুক্ত কবর হোক, যাতে আমি আমার সন্তানদের নিয়ে তার কাছে যেতে পারি।’ সূত্র: আল জাজিরা

 

একুশে সংবাদ/ওজি

Link copied!