গ্রীষ্মের খরতাপের মধ্যে সবুজ গাছগাছালি আর রংবেরঙের ফুলে সেজেছে মৌলভীবাজারের বিভিন্ন সড়কের আশপাশ। শোভা ছড়াচ্ছে কৃষ্ণচূড়া, জারুল, সোনালুসহ নানা ধরনের ফুল গাছ। এসবের মধ্যে অন্যতম হলো লাল সোনাইল, যার বৈজ্ঞানিক নাম `ক্যাসিয়া জাভানিকা`। এটি দেশে দুর্লভ ফুলের মধ্যে একটি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শ্রীমঙ্গল কলেজ রোড সড়কে পাঁচ বছর বয়সী ক্যাসিয়া জাভানিকা গাছের সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ফুটে থাকা গোলাপি ও লাল রঙের ফুল মুগ্ধতার আবেশে ভরিয়ে দিচ্ছে পথচারী, শিক্ষার্থী এবং পর্যটকদের। ফুলটির রঙ গোলাপি ও লাল হওয়ায় অনেক দুর থেকেও এ ফুলটি দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে চলেছে।
২০২১ সালে কলেজ রোড অনলাইন পয়েন্টের সামনে এবং চারুকলা একাডেমি প্রাঙ্গনসহ বিভিন্ন স্থানে চারা রোপণ করেছিলেন শ্রীমঙ্গল ভুনবীর দশরথ স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক প্রকৃতি ও বৃক্ষপ্রেমি সৌখিন ফটোগ্রাফার (ছবির কবি নামে সুপরিচিত) তারিক হাসান। এছাড়া মৌলভীবাজার -সিলেট আঞ্চলিক সড়কের পাশেও শোভা ছড়াচ্ছে সোনালুসহ কৃষ্ণচূড়া, জারুলসহ নানা ধরনের ফুল গাছ।
কলেজ রোডের অনলাইন পয়েন্ট এর সত্ত্বাধিকারী আব্দুর রব রুবেল বলেন, আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনে শিক্ষাগুরু তারিক হাসান স্যারের লাগানো ফুলের চারাটি এখন ছাতার মতো ছড়িয়েছে গাছের ডালাপালা। গাছজুড়ে ফুটেছে ফুল। নতুন ধরনের এ ফুল প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করছে। ফুলের রং গোলাপি হওয়াতে দূর থেকেই মানুষের নজর কেড়ে নেয় এটি। এই গাছটি এলাকার সৌন্দর্য বৃদ্ধিও পাশাপাশি পথচারীদের সুশীতল ছায়াও দিচ্ছে।
প্রকৃতিপ্রেমীরা বলছেন, দুর্লভ ফুলের এই গাছটপ শুধু সৌন্দর্যই ছড়াচ্ছে না, বরং মানুষকে প্রকৃতির কাছাকাছি টেনে নিচ্ছে। অনেকেই এই গাছটির নিচে দাঁড়িয়ে সময় কাটান, কেউ কেউ আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর ছবি শেয়ার করে অন্যদেরও এই সৌন্দর্য উপভোগের আহ্বান জানাচ্ছেন।
শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী পপি আক্তার ও মাফিয়া তাজমিন বলেন, ক্যাসিয়া জাভানিকা গাছটির অপরূপ সৌন্দর্যময় ফুল অনেক দুর থেকে দেখা যায়। কলেজে যাওয়া-আসার পথে ফুলটির সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হয়ে ওই গাছটির নিচে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি। এতে যেন ক্লান্তি দুর হয়ে যায়।
ফুল দেখতে আসা শ্রীমঙ্গল আইডিয়াল স্কুলের শিক্ষক সাইফুল ইসলাম চৌধুরী ও আফসার মিয়া বলেন, ক্যাসিয়া জাভানিকা খুবই সুন্দর ফুল। ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ওই গাছটির নিচে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি এবং ছবি তুলি আমরা। এর রূপ দেখে যেন সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।
প্রতিদিন বিকেল বেলা ক্যাসিয়া জাভানিকা ফুল গাছটির ছায়ায় পানিপুড়ি বিক্রি করেন এক ব্যবসায়ী। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ও বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ গাছটির নিচে এসে ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি পানিপুড়ি খেয়ে যান।
স্থানীয় ট্যুর গাইড শ্যামল দেব বর্মা বলেন, প্রকৃতিগতভাবে শ্রীমঙ্গল এমনিতেই অপার সৌন্দর্যময় উপজেলা। এখানে সবুজাভ চা বাগানসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পট রয়েছে। সবগুলো স্পটই শহরের বাইরে অবস্থিত। তবে শহরের মধ্যে জারুল, কৃষ্ণচূড়া, কনকচূড়া, দেবদারু, নাগকেশর ইত্যাদি ফুল পর্যটক ও স্থানীয়দের তনোমন ভরিয়ে দেয়। এর সাথে গত বছর থেকে যুক্ত হয়েছে ‘ক্যাসিয়া জাভানিকা’ ফুল। দেশের বিভিন্ন স্থানে এ জাতের গাছগুলো সাধারণত পাহাড়ি অঞ্চলেই বেশি দেখা যায়। কিন্তু শ্রীমঙ্গলে গাছটির অবস্থান শহরের অনেকটা কেন্দ্রস্থলে। এখন স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শ্রীমঙ্গলে ভ্রমণে আসা পর্যটকরাও গ্রীষ্ম মৌসুমে ফুলটি দেখতে ভিড় জমান কলেজ রোডে।
জানা যায়, ক্যাসিয়া জাভানিকা ফুলের আদি নিবাস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার ছাড়া ইন্দোনেশিয়াসহ উষ্ণমণ্ডলীয় এলাকায় এ ফুল ফোটে। ক্যাসিয়া জাভানিকা গাছ দ্রুত বর্ধনশীল, মাঝারি আকৃতির, ১০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়ে থাকে। আমাদের দেশে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাস থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে গাছটিতে থোকায় থোকায় গোলাপি ও লাল রঙের ফুল ফোটে। অপরূপ সৌন্দর্যময় ফুলের পাশাপাশি ক্যাসিয়া জাভানিকার নানা ধরনের ভেষজ উপকারিতাও রয়েছে।
প্রাচীনকাল থেকেই কোষ্ঠকাঠিন্য, কোলিক, ক্লোরোসিসের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হতো। গাছটির পাতা হারপিস সিমপ্লেক্সের (এক ধরনের ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট সংক্রমণ) বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখে। গাছটির ছাল বা বাকল আয়ুর্বেদিক ও অন্যান্য ওষুধের অ্যান্টিডায়াবেটিক ফর্মুলেশনের অন্যতম উপাদান। এ ছাড়া এটির ছাল বা বাকল ট্যানারি শিল্পে ব্যবহৃত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এমন শোভাবর্ধনকারী গাছের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি যেমন পরিবেশকে করে তোলে মনোরম, তেমনি মানুষের মানসিক প্রশান্তিতেও রাখে ইতিবাচক প্রভাব। সব মিলিয়ে, শ্রীমঙ্গলের কলেজ রোডের এই ক্যাসিয়া জাভানিকা গাছটি এখন শুধু একটি গাছ নয়-এটি হয়ে উঠেছে সৌন্দর্য, মুগ্ধতা আর প্রকৃতির এক জীবন্ত প্রতীক। গ্রীষ্মের তপ্ত দিনে এটি যেন শহরবাসীর জন্য এক টুকরো শান্তির ছায়া আর রঙিন স্বপ্নের ছোঁয়া।
প্রকৃতি ও বৃক্ষপ্রেমি সৌখিন ফটোগ্রাফার তারিক হাসান বলেন, ২০২১ সালের ১২ রবিউল আওয়াল উপলক্ষে গাছটি রোপণ করি। ক্যাসিয়া জাভানিকা আমাদের দেশের দুর্লভ একটি ফুলের গাছ। শহরতলীর দ্বারিকা পাল মহিলা ডিগ্রি কলেজের পাশে অবস্থিত নুরুল ইসলামের নার্সারী থেকে ২০২১ সালে চারা সংগ্রহ করে কলেজ রোডস্থ কবরস্থানের সামনে পশ্চিম কোনায় এবং চারুকলা একাডেমি প্রাঙ্গনে রোপন করেছিলা।
দুই বছর ধরে এসব গাছে ফুল ফুটছে। ফুলের সমাগম দেখে তখন গাছ লাগানো সার্থকতা অনুভব করি। পথচারীরা এক মুহূর্তের জন্য হলেও থমকে দাঁড়ান আর ফুলের সৌন্দর্যে মোহিত হন। ফুলগাছের সঙ্গে ছবি তুলতে ভুল করেন না কেউ।
প্রকৃতিবিষয়ক লেখক মোকারম হোসেন বলেন, ক্যাসিয়া জাভানিকা ফুল, পাতা বেশ নান্দনিক। এ ফুলের সৌন্দর্যে যেমন সবার মন জয় করছে, অন্যদিকে নানা গুণে ভরপুর এই দুর্লভ উদ্ভিদ। তিনি আরো বলেন, এই ফুলের আদি নিবাস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। সারা পৃথিবীতে উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের বাগানে উদ্ভিদ হিসেবে এর জন্ম হয়। এপ্রিলের মাঝামাঝিতে এই ফুল ফোটে। ক্যাসিয়া জাভানিকা দ্রুত বর্ধনশীল। একে লাল সোনাইল বলা হলেও ফুলটির মধ্যে গোলাপি রঙের আভাই বেশি।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

