প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের অপরিহার্য উপাদান হলো পাখি। প্রজাপতি বাদে পৃথিবীতে কোনো উড়ন্ত সৌন্দর্য থাকলে তা হলো পাখি। তবে পাখির রাজ্যে কোনটি সুন্দরতম তা বলা কঠিন। কারণ, একেকটি পাখি একেক দিকে সুন্দর। এদেশের কমবেশি ৭২৩ প্রজাতির পাখির মেলায় সুন্দর পাখির সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়।
তবে, অনেকের মতে মধুচুষকি গোত্র বা পরিবারের পাখিরাই সুন্দরতম, বিশেষ করে মৌটুসি পাখিরা। কারণ, ওদের সৌন্দর্য সবখানেই ছড়িয়ে আছে-কী গায়ের রঙে, কী ওড়ার ঢঙে, কী গান গাওয়ায়, কী বাসা তৈরিতে? আবার মৌটুসিদের মধ্যে পুরুষ নীলটুনিকে এদেশের সুন্দরতম পাখি হিসেবে গণ্য করা হয়।
ছোট্ট সুদর্শন অন্যতম সুন্দর ও দুর্লভ আবাসিক পাখি ‘সিঁদুরে মৌটুসি’ এদেশের চিরসবুজ ও পাতাঝরা বন, ক্ষুদ্র ঝোপ ও বাঁদাবনে বিচরণ করে। অনেক সময় গ্রাম ও শহরতলীর সুমিষ্ট মধুসম্পন্ন ফুল বাগানেও ঘুর ঘুর করতে দেখা যায়।
সম্প্রতি এই পাখিটির দেখা মিলে হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে। সুদর্শন পাখিটি দেখে চিত্র ধারণ করতে করতে ভুলেননি শ্রীমঙ্গলের শৌখিন ফটোগ্রাফার তারিক হাসান। গতকাল ফেসবুকে এই পাখির দারুণ ছবি তুলে প্রশংসায় ভাসছেন শ্রীমঙ্গল ভুনবীর দশরথ স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক ছবির কবিখ্যাত তারিক হাসান।
পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম ইথোপিগা সিপারাজা। বাংলাদেশ ছাড়াও প্রজাতিটিকে ভারত ও চীনসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা যায়। এটি সিঙ্গাপুরের জাতীয় পাখির মর্যাদা লাভ করেছে। সিঁদুরে মৌটুসির টোনা লম্বায় প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার ও টুনি ১০ সেন্টিমিটার। ওজনে ৮ থেকে ১১ গ্রাম। টোনা-টুনির পালকের রঙে অনেক পার্থক্য। টোনার গলা, বুক ও বুকের দু-পাশ উজ্জ্বল লাল। চঞ্চুর গোড়া থেকে গলার দু-পাশে গোঁফের মতো ধাতব নীলচে-সবুজ ডোরা রয়েছে।
মাথার চাঁদি ধাতব সবুজ। রোদের আলোয় মাথার চাঁদি ও গোঁফ চকচক করতে থাকে। পিঠ কালচে গাঢ় বা মেরুন লাল। কোমড়ের পালক হলুদ। লেজের লম্বা পালক সবুজ যার আগার বাইরের দিকটা সাদা। পেট ও পায়ুর পালক হলদে-জলপাই। ডানার গোড়া লালচে-জলপাই ও বাকিটা গাঢ় জলপাই। টুনির দেহের উপরটা জলপাই-সবুজ ও নিচটা হলদে-জলপাই। লেজ গোলাকার, যার আগা সাদা। গলা ও বুকের উজ্জ্বল লাল আভা ছাড়া অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি দেখতে মায়ের মতো। টোনা-টুনি নির্বিশেষে পা, আঙুল, নখ ও বাঁকানো চঞ্চুটি কালচে-বাদামি।
বিশ্বের ক্ষুদ্রতম পাখির গোষ্ঠি হামিংবার্ডের মতো মৌটুসিরাও বাতাসে স্থির থেকে উড়তে পারে। এরা প্রজাপতি, ভ্রমর ও মৌমাছিদের মতো ফুলে ফুলে নেচে নেচে মধু পান করে বেড়ায়। অত্যন্ত চঞ্চল পাখি এরা, বেশিক্ষণ এক জায়গায় থাকে না। বাতাসে ঢেউ খেলিয়ে আলোর ঝিলিকের মতো এগাছ থেকে ওগাছে, এ ফুল থেকে ও ফুলে উড়ে বেড়ায়। পুরুষ পাখি বা টোনা বেশ আমুদে।
ফুলের নির্যাস বা মধু পানের জন্য মৌটুসিদের রয়েছে লম্বা ও নিচের দিকে বাঁকানো ঠোঁট বা চঞ্চু, যা ফুলের ভেতরে ঢুকিয়ে খাঁজকাটা ও রবারের ডগারের মতো জিহ্বাটি দিয়ে মধু পান করে। নির্যাসের অভাবে ছোট ছোট পোকামাকড়ও খেতে পারে। ফুলেরবোঁটার ওপর বসে বাদুড়ের মতো ঝুলে পড়ে যেভাবে ফুলের রস চুষে তা দেখতে বেশ লাগে।
মৌটুসিদের পালক অত্যন্ত বাহারি রঙের। তবে, এই বাহারি রং শুধু পুরুষ বা টোনাদের মধ্যেই দেখা যায় এবং তা শুধু প্রজননকালে সীমাবদ্ধ। বাহারি পালকগুলোর উপর সূর্যের আলো পড়লে চকচক করে উঠে, তখন সৌন্দর্য যেন বহুগুণ বেড়ে যায়। মৌটুসিরা পুরনো বিশ্ব অর্থাৎ আফ্রিকা, ইউরোপ, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার পাখি।
বিশ্বে সর্বমোট ১৪৬টি প্রজাতির মৌটুসি দেখা যায়। এদের মধ্যে এদেশে রয়েছে ৯টি, যার ৫টি আবাসিক ও ৪টি পরিযায়ী। এদেশের ৯ প্রজাতির মৌটুসি পাখি রয়েছে। এর মধ্যে ৩টি অতি বিরল। সিঁদুরে-লাল মৌটুসি পাখির জিব নলাকার, যা নলাকার ফুলের নির্যাস পান করার উপযোগী। এরা পোকামাকড়ও খেতে পারে। বাচ্চাদের মাকড়সার ছোট ছোট বাচ্চা খাওয়ায়। সাধারণত একাকী বা জোড়ায় বিচরণ করে। অনেক সময় অন্যান্য প্রজাতির নীলটুনি-মৌটুসির সঙ্গেও দলে দেখা যায়। তীব্র স্বরে ‘চি-চিই-চিই’ শব্দে ডাকে।
এপ্রিল-জুলাই প্রজননকাল। এ সময় স্ত্রী-পুরুষ মিলে ছোট গাছ বা ঝোপঝাড়ের ঝুলন্ত সরু ডালে শিকড় বা চিকন আঁশ দিয়ে ঝুলন্ত বাসা বানায়। এদের বাসা নীলটুনির থেকে লম্বা ও চাপানো এবং দেখতে খোসা ছাড়ানো পাকা ধুন্দলের মতো। এরপর স্ত্রী শৈবাল ও মাকড়সার জাল দিয়ে বাসার ওপরে আবরণ বা লাইনিং দেয়। বাসা বানানো হলে স্ত্রী দু-তিনটি সাদা ডিম পাড়ে, যাদের চওড়া প্রান্তে গোলাপি বা লালচে ছিট থাকে। স্ত্রী একাই তা দিয়ে ১৪-১৫ দিনে বাচ্চা তোলে। স্ত্রী-পুরুষ উভয়েই বাচ্চাদের খাওয়ায়। বাচ্চারা ২২-২৩ দিনে বড় হয়ে যায় ও নীল আকাশে স্বপ্নের ডানা মেলে।
বাংলাদেশ ছাড়াও দেখা যায় ভারত, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে। বিশ্বে এদের বিস্তৃত প্রায় ৪৯ লাখ ২০ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে। পুরুষ পাখি লম্বা ১৫ সেন্টিমিটার, স্ত্রী পাখি ১০ সেন্টিমিটার। দেহের তুলনায় লেজ খানিকটা বড়। ঠোঁট লম্বা, বড়শির মতো বাঁকানো। পুরুষ পাখির কপাল উজ্জ্বল বেগুনি, তার ওপর হালকা ডোরা দাগ। মাথার পেছন থেকে পিঠ ও ডানার কিছু অংশ সিঁদুরে লাল। পিঠের শেষ থেকে লেজের গোড়া পর্যন্ত হলুদাভ-জলপাই।
লেজ বেগুনি। থুতনি থেকে বুক পর্যন্ত সিঁদুরে লাল। পেটের দিকটা হলুদাভ-জলপাই। স্ত্রী পাখির শরীর জলপাই রঙের। লেজের প্রান্তর সাদা। প্রধান খাবার ফুলের মধু। প্রজনন মৌসুম মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত।
ভূমি থেকে ২ মিটার উঁচুতে গাছের ডালে অথবা গুল্মলতা আচ্ছাদিত গাছের ডালে থলে আকৃতির বাসা বাঁধে। ডিম পাড়ে ২টি। ফুটতে লাগে ১৫ থেকে ১৭ দিন। এই পাখিগুলো স্বভাবে অত্যন্ত চঞ্চল ও ফুর্তিবাজ। দিনের বেশিরভাগ সময় গাছের শাখাপ্রশাখায় নেচে বেড়ায়। প্রজনন মৌসুমে জোড়ায় জোড়ায় দেখা যায়।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

