চাঁদপুরের মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনায় বাংলাদেশের নৌ-দুর্ঘটনার ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ অধ্যায় ‘এমভি নাসরিন-১’ লঞ্চডুবির ২৩ বছর পূর্ণ হলো।
২০০৩ সালের ৮ জুলাই ঢাকা-লালমোহন রুটে চলাচলকারী এই লঞ্চটি ডুবে গিয়ে প্রায় ৮০০ যাত্রীর প্রাণহানি ঘটেছিল। দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ভোলার মানুষের স্মৃতিতে সেই দুঃসহ দিনটি এখনো তাজা হয়ে আছে। ১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর ভোলাবাসীর জীবনে এটিকে সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয় হিসেবে গণ্য করা হয়।
সেদিন লঞ্চটিতে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি যাত্রী ও মালামাল বোঝাই ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অতিরিক্ত চাপ এবং প্রবল স্রোতের কারণে লঞ্চের তলা ফেটে গিয়ে মুহূর্তেই তা তলিয়ে যায়। দুর্ঘটনার দুদিন পর মেঘনার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল পরিণত হয়েছিল লাশের নদীতে। নদীর তীর ও ঝোপঝাড়ে ভেসে ওঠা সেই বীভৎস দৃশ্য প্রত্যক্ষদর্শীদের মনে আজও গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘কোস্ট ট্রাস্ট’-এর তথ্যমতে, এই ট্র্যাজেডিতে আট শতাধিক যাত্রী নিহত বা নিখোঁজ হন। শনাক্ত হওয়া যাত্রীদের মধ্যে চরফ্যাশনের ১৯৮ জন, লালমোহনের ২৬৪ জন এবং তজুমদ্দিনের ১৩ জন ছিলেন।
নিহতদের তালিকায় ছিল ১১০ জন নারী, ৯৬ জন শিশু ও বৃদ্ধ, ৬৬ জন গৃহিণী, ৫৪ জন দিনমজুর, ৩৬ জন ব্যবসায়ী, ৩৩ জন ছাত্র এবং ৩৩ জন রিকশা-ভ্যানচালক। এই ঘটনায় ৪০২টি পরিবার তাদের সদস্য হারিয়েছে এবং ১২৮টি পরিবার হারিয়েছে তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে।
এত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবার এখনো ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। গত বছর ভোলা আইনজীবী সমিতি ভবনে লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলো তাদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও বেদনার কথা তুলে ধরেন। সভায় ‘লঞ্চ ডুবিতে আহত ও নিহতদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের আইনগত বাধ্যবাধকতা’ নিয়ে আলোচনা হলেও বাস্তবে মেলেনি কোনো সুরাহা।
এমভি নাসরিন-১ ট্র্যাজেডির ২৩তম বার্ষিকীতে নিহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে নৌপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল পরিবহন বন্ধে কঠোর নজরদারি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর যথাযথ পুনর্বাসন এখন সময়ের দাবি। তারা মনে করেন, বিচারহীনতা এবং রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার কারণেই নৌপথের নিরাপত্তা এখনো ঝুঁকির মুখে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেবল শোক পালনেই সীমাবদ্ধ না থেকে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করাই হতে পারে এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির শিকার হওয়া মানুষগুলোর প্রতি প্রকৃত সম্মান।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

