ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আধ্যাত্মিক আবহে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের ঐতিহাসিক বারদী আশ্রমে বুধবার (৩ জুন) সকালে পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাধক শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর ১৩৬তম তিরোধান উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে।
দেশ-বিদেশ থেকে আগত লাখো ভক্তের পদচারণায় ইতোমধ্যে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো বারদী এলাকা। তিন দিনব্যাপী এ ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে আশ্রম প্রাঙ্গণে বিরাজ করছে এক অনন্য উৎসবমুখর পরিবেশ। ভোর থেকেই ভক্তরা আশ্রমে সমবেত হয়ে পূজা-অর্চনা, প্রার্থনা ও নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। আশ্রমের বিভিন্ন স্থাপনা বর্ণিল আলোকসজ্জা ও নান্দনিক সাজে সজ্জিত করা হয়েছে, যা ভক্ত ও দর্শনার্থীদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে।
উৎসবে অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও প্রতিবেশী ভারতসহ বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে হাজারো লোকনাথ ভক্ত বারদীতে এসেছেন। তাঁদের জন্য আশ্রম কর্তৃপক্ষ তীর্থনিবাসসহ বিভিন্ন স্থানে আবাসন ও খাবারের বিশেষ ব্যবস্থা করেছে। তিরোধান উৎসব উপলক্ষে বারদী এলাকায় বসেছে সাত দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী মেলা। মেলায় বিভিন্ন ধরনের লোকজ পণ্য, ধর্মীয় সামগ্রী এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ স্থান পেয়েছে। ফলে ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি উৎসবটি পরিণত হয়েছে এক মিলনমেলায়।
উৎসবের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে পূজা-অর্চনা, ঊষাকীর্তন, গীতাপাঠ, বাল্যভোগ ও রাজভোগ বিতরণ, প্রসাদ বিতরণ, ধর্মীয় আলোচনা, ভক্তিমূলক সংগীত এবং সন্ধ্যাকালীন কীর্তন। এসব আয়োজনে অংশ নিয়ে ভক্তরা মহাসাধকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন এবং নিজেদের ও পরিবারের কল্যাণ কামনা করছেন।
তিরোধান উৎসব উপলক্ষে লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম কর্তৃপক্ষ দিনব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রভাত কীর্তন, গীতাপাঠ, লোকনাথ ব্রহ্মচারীর জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে আলোচনা, বাল্যভোগ ও রাজভোগ বিতরণ, ভক্তিমূলক সংগীত, সন্ধ্যা আরতি, ফলপ্রসাদ ও জলপ্রসাদ বিতরণসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান। আগত ভক্তরা সকাল-সন্ধ্যা আরাধনা করছেন মনোস্কামনা পূরণের আশায়।
এ ছাড়া উৎসবে আগতদের জন্য বিনামূল্যে শিশুদের দুধ বিতরণ, ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা, মিষ্টি, চিড়া-মুড়ি, বাতাসা, পানি ও শরবত বিতরণের ব্যবস্থা নিয়েছে লোকনাথ সেবা সংঘ, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ, সীতারাম সংঘ, শারদাঞ্জলি ফোরাম বাংলাদেশসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।
গতকাল মঙ্গলবার আশ্রম এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ ব্রিফিং ও প্যারেড অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী। তিনি জানান, উৎসবস্থলে পুলিশ, র্যাব, আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ছয় শতাধিক সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি সিসিটিভির মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি, মেঘনা নদীতে নৌ-পুলিশের টহল এবং অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
সোনারগাঁ থানার ওসি গোলাম সারোয়ার বলেন, ভক্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। উৎসব চলাকালে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকবে।
বারদী লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শংকর কুমার দে বলেন, উৎসবের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আগত ভক্তরা যাতে নির্বিঘ্নে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে পারেন, সে লক্ষ্যে আশ্রম কর্তৃপক্ষ সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিয়েছে।
সোনারগাঁ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ আল জিনাত জানান, উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভক্তদের নির্বিঘ্ন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মতে, লোকনাথ ব্রহ্মচারী ১৭৩০ খ্রিস্টাব্দে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসাতের দেগঙ্গা থানার কচুয়া (কাঁকড়া) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা রাম নারায়ণ ঘোষাল এবং মা কমলা দেবী। লোকনাথ ব্রহ্মচারী ছিলেন তাঁদের কনিষ্ঠ সন্তান। তিনি হিমালয়ে গিয়ে ৪০ বছর সাধনা করেন। পরবর্তীতে আফগানিস্তানের কাবুলে আরবি ভাষা ও কুরআনশাস্ত্র অধ্যয়ন করে ইসলাম ধর্ম ও এর দর্শন সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন।
‘মানবতাই মানুষের শ্রেষ্ঠ ধর্ম’—এই বাণী অন্তরে ধারণ করে মানবকল্যাণে কাজ করতে তিনি দীর্ঘ ২৬ বছর নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার বারদী এলাকায় অবস্থান করেন। ১৬০ বছর বয়সে ১৯ জ্যৈষ্ঠ বারদী আশ্রমে তাঁর মহাপ্রয়াণ ঘটে। এরপর থেকে প্রতি বছর ১৯ জ্যৈষ্ঠ লোকনাথ ব্রহ্মচারীর তিরোধান দিবস পালন করে আসছে আশ্রম কর্তৃপক্ষ।
ভক্তদের বিশ্বাস, মানবতা, প্রেম ও সেবার যে বাণী লোকনাথ ব্রহ্মচারী রেখে গেছেন, তা আজও মানুষকে আলোকিত পথের সন্ধান দেয়। সেই বিশ্বাসের টানেই প্রতি বছর লাখো ভক্ত সমবেত হন বারদীর এই পবিত্র তীর্থভূমিতে।
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

