দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশক ধরে ভাটির জনপদ সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনের রাজনীতিতে একটি নামই ছিল কেন্দ্রবিন্দুতে—সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। একাত্তর-পরবর্তী প্রায় প্রতিটি নির্বাচনে ‘নৌকা’ প্রতীক ও ‘সেন পরিবার’-এর আধিপত্যে থাকা এই আসনের নির্বাচনী মানচিত্র এবার আমূল বদলে গেছে। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়া এবং ড. জয়া সেনগুপ্তের ভোট বর্জনের ঘোষণায় সৃষ্টি হয়েছে এক বিশাল রাজনৈতিক শূন্যতা।
এই শূন্যতা দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা।
দিরাই-শাল্লার রাজনীতিতে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন এক ভাটির নক্ষত্র। তাঁর মৃত্যুর পর স্ত্রী ড. জয়া সেনগুপ্ত সেই রাজনৈতিক ধারা বজায় রেখেছিলেন। তবে এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। আওয়ামী লীগ ঘরানার প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট এবার কোন দিকে যাবে—তা নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা।
মঙ্গলবার শাল্লা উপজেলার হবিবপুর ইউনিয়নের শাসখাই বাজারে সমাবেশ করেন বিএনপি প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরী। পরদিন একই স্থানে বড় সমাবেশ করেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শিশির মনির। দুই সমাবেশেই সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের একনিষ্ঠ অনুসারী ও হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভোটারদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত ‘সুরঞ্জিতের আমানত’ দখলের প্রতিযোগিতা।
বিএনপি প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরী একজন অভিজ্ঞ ও পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ। ১৯৯৬ সালে তিনি সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। তাঁর সমর্থকদের দাবি, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কারণে যারা এতদিন ধানের শীষে ভোট দিতে পারেননি, এবার তারা সংগঠিতভাবে বিএনপির পক্ষে ভোট দেবেন। নাছির চৌধুরীর সমাবেশে সুরঞ্জিত-অনুসারী অনেক সংখ্যালঘু নেতার বক্তব্য সেই ইঙ্গিতই দেয়।
অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী শিশির মনির নিজেকে তুলে ধরছেন ‘সংকটকালের সঙ্গী’ হিসেবে। সাম্প্রতিক সময়ে দলীয় কর্মী ও সাধারণ মানুষের পাশে থেকে আইনি ও মানবিক সহায়তার মাধ্যমে তিনি একটি শক্ত সামাজিক ভিত্তি তৈরি করেছেন। তাঁর সমাবেশে রবীন্দ্র দাস, রথীন্দ্র দাস ও মন্টু দাসের মতো সংখ্যালঘু নেতাদের উপস্থিতি ভোটারদের মধ্যে নতুন মেরুকরণ ও কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।
এই আসনের সর্বশেষ সংসদ সদস্য ড. জয়া সেনগুপ্ত এবার নির্বাচনে নেই। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি ভোট বর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন। এই আহ্বান আওয়ামী লীগ সমর্থকদের কেন্দ্রে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। দিরাই-শাল্লার প্রায় ২০ শতাংশ ভাসমান বা নীরব ভোটার এবং ৪০ শতাংশ আওয়ামী ঘরানার ভোটারই এবার জয়ের চাবিকাঠি। তারা কেন্দ্রে না গেলে ভোটের হার কমার পাশাপাশি পাল্টে যেতে পারে ফলাফলের সমীকরণ।
২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে এই আসনে ভোট পড়েছিল প্রায় ৮০ শতাংশ। তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপিবিহীন ভোটে তা নেমে আসে ৪৫.৯১ শতাংশে। এবার সব দলের অংশগ্রহণে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আবহ তৈরি হলেও আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি ভোটের পরিসংখ্যানে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে কৌতূহলী স্থানীয়রা।
নাছির উদ্দিন চৌধুরী ও শিশির মনিরের দ্বৈরথের মাঝেও মাঠ ছাড়ছেন না সিপিবির প্রার্থী নিরঞ্জন দাস খোকন। ‘কাস্তে’ প্রতীক নিয়ে তিনি বামপন্থি ও প্রগতিশীল ভোটারদের আকর্ষণের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের স্মৃতিকে পুঁজি করে এবং আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংককে লক্ষ্য করে দিরাই-শাল্লায় এখন চলছে ভোটের তীব্র প্রতিযোগিতা। বিএনপি চায় হারানো আসন পুনরুদ্ধার করতে, আর জামায়াত চাইছে সামাজিক ও আইনি ইমেজে ভর করে নতুন ইতিহাস গড়তে। ড. জয়া সেনগুপ্তের ভোট বর্জনের আহ্বান ও প্রার্থীদের ভোট টানার এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালটই দেবে চূড়ান্ত রায়।
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

