সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার শিমুলবাক ইউনিয়নের থলের বন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের চরম অবহেলা, অনিয়মিত উপস্থিতি এবং সীমাহীন স্বেচ্ছাচারিতায় ১০৯ জন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন এখন গভীর অনিশ্চয়তায়।
সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণ করলেও পাঠদানে চরম অনীহা এবং দুপুর না হতেই স্কুল তালাবদ্ধ করে পলায়নের ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহল। শিক্ষকরা কোমলমতি শিশুদের মিথ্যা বলতে বাধ্য করছেন বলেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে দুপুর ২টায় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায় এক বিষাদময় দৃশ্য। যেখানে বিকেল ৪টা পর্যন্ত পাঠদান চলার কথা, সেখানে দুপুর ২টার কাঁটা ছুঁতেই বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে ঝুলছে তালা। অথচ স্কুল ইউনিফর্ম পরা ১০-১২ জন শিক্ষার্থী তখনো বাইরে রোদে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী রিমান ও সফুল হাসান জানায়, "স্যাররা প্রতিদিন বেলা ১১টায় আসেন আর ২টা বাজলেই স্কুল ছুটি দিয়ে দেন। যাওয়ার সময় আমাদের কঠোরভাবে বলে দেন, কেউ যদি জিজ্ঞেস করে তবে যেন বলি বিকেল ৪টায় ছুটি হয়েছে। কোনোদিন একটা ক্লাস করান, আবার কোনোদিন তাও করান না। তারা কেবল অফিসে বসে মোবাইল টিপেন আর চা খান।"
ঘটনার সময় প্রধান শিক্ষক সুমন কান্তি তালুকদারকে মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি দম্ভের সাথে দাবি করেন যে তিনি বিদ্যালয়েই আছেন। কিন্তু সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে কিছুক্ষণ পর দুই সহকারী শিক্ষককে সাথে নিয়ে তড়িঘড়ি করে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন তিনি। এ সময় নিজের চেহারা আড়াল করতে মুখে মাস্ক পরে অফিস কক্ষের তালা খোলেন। অফিস খুললেও তখনো ক্লাসরুমগুলো তালাবদ্ধ ছিল এবং শিক্ষার্থীরা বাইরে দাঁড়িয়ে শিক্ষকদের এই লুকোচুরি দেখছিল। সহকারী শিক্ষক সুবল চন্দ্র দাসের অনুপস্থিতির বিষয়ে প্রধান শিক্ষক কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
রেকর্ড অনুযায়ী বিদ্যালয়ে ১০৯ জন শিক্ষার্থী থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক স্তরের কোনো ক্লাস আজ অবধি নেওয়া হয়নি। শিশুদের শিক্ষার বুনিয়াদ গড়ার এই স্তরটি শিক্ষকদের অলসতায় পুরোপুরি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।
নির্ধারিত সময়ের আগে স্কুল ছুটি দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে সহকারী শিক্ষক আব্দুল হালিম ও শাহানূর মিয়া আজব দাবি তুলে বলেন, "আজ আমরা গণভোটের প্রচারের জন্য প্রধান শিক্ষকের নির্দেশনায় স্কুল বন্ধ করেছি।" প্রধান শিক্ষক সুমন কান্তি তালুকদারও একই কথা বলেন এবং দায় চাপান শিক্ষা অফিসের ওপর। তিনি দাবি করেন, শিক্ষা অফিস থেকে তাদের গণভোটের প্রচারে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে সাধারণ কর্মদিবসে শিশুদের পাঠদান বন্ধ করে শিক্ষকদের এমন `প্রচার কার্যক্রমে` যাওয়ার কোনো প্রমাণ বা বৈধ আদেশ তারা দেখাতে পারেননি।
শিক্ষকদের এই অবহেলার কারণে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের স্কুল থেকে সরিয়ে নিচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দা খালেদা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, "আমার তিন সন্তান এই স্কুলে পড়ে, কিন্তু তারা নিজের নামটাও ঠিকমতো লিখতে পারে না। শিক্ষকরা সরকারি টাকা বসে বসে খাচ্ছেন আর আমাদের সন্তানদের জীবন নষ্ট করছেন। আমি এখন বাধ্য হয়ে তাদের মাদ্রাসায় ভর্তি করার কথা ভাবছি।"
মল্লিকা বেগম নামের অন্য এক অভিভাবক বলেন, "প্রতিদিন নাতিকে নিয়ে আসি, দেখি স্কুল বন্ধ। ১১টায় স্যাররা আসেন, আবার ১ ঘণ্টা পরেই ছুটি দিয়ে চলে যান। এরা শিখবে কী? স্কুলটা এখন তাদের আড্ডার জায়গায় পরিণত হয়েছে।"
শান্তিগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, সরকারি নিয়ম অমান্য করে স্কুল বন্ধ রাখা বা দেরিতে আসার কোনো সুযোগ নেই। এই শিক্ষকদের বিরুদ্ধে এলাকাবাসী ও অভিভাবকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ পেলে আমার জন্য আরও সুবিধা হত। তখন ঘটনার তদন্ত করে অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা এই শিক্ষকদের দ্রুত অপসারণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাদের দাবি, অবিলম্বে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা না হলে তারা বিদ্যালয়ের গেটে স্থায়ীভাবে তালা ঝুলিয়ে দেবেন এবং বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেবেন।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

