AB Bank
ঢাকা বুধবার, ১৭ জুলাই, ২০২৪, ২ শ্রাবণ ১৪৩১

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad
ekusheysangbad QR Code
BBS Cables
Janata Bank
  1. জাতীয়
  2. রাজনীতি
  3. সারাবাংলা
  4. আন্তর্জাতিক
  5. অর্থ-বাণিজ্য
  6. খেলাধুলা
  7. বিনোদন
  8. শিক্ষা
  9. তথ্য-প্রযুক্তি
  10. অপরাধ
  11. প্রবাস
  12. রাজধানী

ঋণের জালে বন্দী জেলে


Ekushey Sangbad
ফাহাদ হোসেন, মোরেলগঞ্জ, বাগেরহাট
০৬:৩১ পিএম, ২৯ অক্টোবর, ২০২২
ঋণের জালে বন্দী জেলে

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলায় বছরে প্রায় ১ হাজার জেলে জীবনের ঝুকি নিয়ে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যায়। উপকূলীয় এই উপজেলায় নদী তীরবর্তী গ্রামে বসবাসকারী জেলেরা বরাবরই মহাজন ও দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি। এসকল অসাধু ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পরে তারা হারাচ্ছে তাদের প্রাপ্ত অধিকার।

 

জেলেরা জানায়, জাল, ট্রলার কিংবা নৌকা ক্রয় করার মত সামর্থ নেই তাদের। চড়া সুদে মহাজন ও দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আগাম টাকা নিয়ে মাছ ধরার জন্য নদীতে পাড়ি জমায় তারা। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নৌকাডুবির মত ঘটনা ঘটলেও ঋনের কিস্তি কোনভাবেই যেন মাফ হয় না এখানকার জেলেদের।

 

সমুদ্রে দিন-রাত হাড় ভাঙ্গা খাটুনি দিয়ে যে মাছ পায় সেটা বিক্রি করে যে টাকা আয় হয় তার ১ ভাগ মহাজনের, ১ ভাগ দাদন ব্যবসায়ীর বাকী যে টুকু থাকে তা নিজের ভাগ্যে জুটে। অনেক সময় দেখা যায় কষ্ট করে মাছ আহরন করে অর্ধেক মূূল্যে মহাজনের গদিতে তুলে দিতে হয়। ফলে মাছের লভ্যাংশ চলে যায় মহাজনের পকেটে, জেলেদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় না।

 

গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যায় মোরেলগঞ্জের জেলে আলী আকবর মাহাজনের কাছ থেকে অগ্রিম ৩ মাসের বেতন নিয়েছেন। কারন আগামী ৫ মাস পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বঙ্গোপসাগরে মাহজনের সাথে মাছ ধরতে যাবে আকবর।

 

গভীর সমুদ্রের জেলে জীবন সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, মোগো জাল নাই, মাহজনের লগে বেতনে যাই। মাহজন দাদনে সুদে টাহা লইয়া আমাগোরে ২/৩ মাসের অগ্রিম বেতন দিয়া সাগরে লইয়া যায়, হেই টাহা দিয়া পোলা-মাইয়ারে বাজার সদায় কইরা দিয়া যাই। ৫/৬ মাস পোলা-মাইয়ার মুখ দেহি না। বাড়ি দিয়া যাওয়ার সময় দাবি দাওয়া ছাড়াইয়া যাই।কারন সমুদ্রে মোগো কোন নিরাপত্তা নাই।অভাবের টানে যাইতে হয়, মাহজন সুদের টাহা শোধ দিয়া দাদন পরিশোধ শেষে মাহজনেরও সমানে সমান থাইকা যায়। মোগো বেতন ছাড়া আর কি দেবে, এভাবে সাগরে মাছ ধরার অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন আলী আকবর।

 

শুক্রবার (২৮ অক্টোবর) সরেজমিনে মোরেলগঞ্জের পানগুছি নদী তীরবর্তী  কয়েকটি গ্রামে গিয়ে দেখা গেল সুমুদ্রে মাছে শিকার করতে যওয়া জেলেদের বাস্তব চিত্র।ঘাটে বাঁধা নৌকা, নৌকায় ছড়ানো জাল, উঠানের কোণে গাবের মটকি, ঘরে ঘরে চরকি, সুতা কাটার, জাল বোনার সরঞ্জাম ইত্যাদি। এই সব নিয়াই জেলেদের সংসার। তারা ২-১ দিনের মধ্যে তারা সমুদ্রে মাছ ধরার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিবে।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জেলে জানান, হতদরিদ্ররা জেলেরা প্রভাবশালী মহলের শোষণের শিকার। কিছু দাদনদার ছল-চাতুরীর মাধ্যমে অর্ধেক মুল্যে মাছ হাতিয়ে নেয়। সময়-সুযোগ মতো চালান বাবুরাও এদের ঠকায়।

 

পুটিখালি ইউনিয়নের একজন  জেলে আলাউদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‍‍`মোরা হারা বচ্ছর মাছ ধইরা কিছুই করতে পারি না,কোনো রহম পোলা-মাইয়া লইয়া বাঁইচ্ছা থাহি, আর মোগো গোনে যারা মাছ কিন্না ব্যাছে, হেরা রাইতের মধ্যে ধনী অইয়া যায়।‍‍`

 

সাগর মোহনায় মাছ ধরতে যাওয়া এসব জেলেদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন আজও হয়নি। জেলেদের আহরণ করা মাছ বিদেশে রপ্তানি করে যেসব ব্যবসায়ী কোটিপতি হয়েছেন, তারাও এদের ব্যাপারে উদাসীন। তারা একের পর এক ব্যবসার সম্প্রসারণ ঘটিয়েছেন মোরেলগঞ্জের জেলে পল্লীগুলো রয়ে গেছে আগের মতো-ই।

 

জেলেদের দাবি সরকার তাদের যদি ঋনের সুযোগ করে দেয়। মাছ ধরার জন্য বিনামুল্যে জাল বিতরণ করে  তাহলে তারা সামুদ্রিক মাছের সঠিক মুল্য পাবে। প্রভাবশালীদের খপ্পরে পড়তে হবে না ,দাদন ব্যাবসায়ীদের কাছে জিম্মি হতে হবে না,তাছাড়া মোরেলগঞ্জ-শরনখোলা অঞ্চলে (বিএফডিসি) কোনো মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র আজও গড়ে ওঠেনি। এতে বঙ্গোপসাগরের এ অঞ্চলের জেলেদের আহরিত মৎস্যসম্পদের কোটি কোটি টাকা প্রতি মৌসুমে হাতিয়ে নিচ্ছে দাদন ব্যবসায়ী মধ্যস্বত্বভোগী ও ফড়িয়ারা।

 

মোরেলগঞ্জ উপজেলা মৎস অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে এবার মোরেলগঞ্জের প্রায় ১ হাজার  জেলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছেন।

 

উপজেলার  পঞ্চকরণ,  কাস্মির, তুলাতলা, কুমারখালী, আমতলী, মধ্য বরিশাল, পশুরবুনিয়া,  চন্ডিপুর, উত্তর বারইখালী, কাষ্মির,  বদনী ভাঙ্গা, পাঠামারা, গাবতলা, কাঠালতলা  গ্রামের বাসিন্দারা সাগরে মাছ শিকার করে তারা যা আয় করেন তার সুষ্ঠু বিপনন ব্যবস্থার অভাবে সিংহভাগ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগী দাদন ব্যবসায়ী ও ফড়িয়ার পকেটে।

 

বিএফডিসি কেন্দ্র না হওয়ায় জেলেরা কিনারে না এসে সাগরেই তাদের মাছ পানির দরে মধ্যস্বত্বভোগী দাদন ব্যবসায়ী ও ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করে দেন। এ অঞ্চলে কয়েকশত ফড়িয়া চক্র রয়েছে। মাছ বিক্রির শর্তে তারা জেলেদের দাদন দিয়ে থাকেন। শর্ত ভঙ্গ করলে জেলেদের ওপর নেমে আসে কঠিন অত্যাচার। এমনকি তাদের জাল-নৌকা রেখে দেওয়া হয় টাকার জন্য, স্থানীয় জেলেরা এই অঞ্চলে  মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র স্থাপনের জোর দাবি জানিয়েছেন।

 

এ বিষয়ে মোরেলগঞ্জ উপজেলা মৎস কর্মকর্তা বিনয় কুমার রায় বলেন এ বছর মোরেলগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ১ হাজার জেলে সমুদ্রে মাছ ধরতে যাবে। তাদেরকে সরকারের পক্ষ থেকে চাল বিতরণ করা হয়েছে। আর্থিক কোন সহযোগিতা আমরা করতে পারি নি। তবে উপকূলীয় এই উপজেলায়  সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেরা যদি এ অঞ্চলে বিএফডিসি কেন্দ্রের জন্য বা তাদের কোন দাবি আমাদের কাছে লিখিত ভাবে তুলে ধরেন তবে সেটি উর্ধতন কতৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।

 

একুশে সংবাদ/পলাশ

Link copied!