AB Bank
  • ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২৬,

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad QR Code
BBS Cables
Janata Bank
  1. জাতীয়
  2. রাজনীতি
  3. সারাবাংলা
  4. আন্তর্জাতিক
  5. অর্থ-বাণিজ্য
  6. খেলাধুলা
  7. বিনোদন
  8. শিক্ষা
  9. তথ্য-প্রযুক্তি
  10. অপরাধ
  11. প্রবাস
  12. রাজধানী

“ব্যাংকারের জীবন ও অভিলাষ”


Ekushey Sangbad
তারিক আফজাল
০৬:৩৩ পিএম, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

“ব্যাংকারের জীবন ও অভিলাষ”

প্রয়াত বিখ্যাত মার্ক টোয়েনের “রোদ হলে বন্ধু আর বৃষ্টি হলে স্বার্থপর” উক্তিটি অভিজ্ঞতা আর অনুধ্যানের আলোকে এক পক্ষের হতাশা—এই উপলব্ধিই এক ব্যাংকারের পুরো জীবনের প্রাপ্তি।

ছোটবেলায় বাবা-মায়ের চাহিদা, আত্মীয়-স্বজনের প্রভাব—সন্তান ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা সরকারি অফিসার হবে। সন্তানের স্বপ্ন—“আমি পাইলট হব, পুলিশ বা আর্মি হব।” একদিকে পেশার গাম্ভীর্য, অন্যদিকে সন্তানের দেখা মনোকামনার জৌলুস—পেশাদারিত্ব, তেজ আর বীরত্ব সাধারণত প্রতিটি পরিবারের কাছেই এই পেশার মানুষকে সম্মানিত করে। তারই ধারাবাহিকতায় পরিবারপ্রধান সন্তানদের পথ দেখান।

আমার যতদূর মনে পড়ে, “বড় হয়ে আমার সন্তান ব্যাংকার হবে”—এই রকম চিন্তাভাবনা বা প্রতিশ্রুতি কখনো শুনিনি। ব্যাংকিং পেশা যেন এক—“ব্যাংকে পরীক্ষা দাও, কিছু না হলে আপাতত জীবন শুরু কর।” এরই প্রতিফলন। অথচ অ্যাকাউন্ট ওপেনিং থেকে শুরু করে অভিভাবক মৃত্যুর পর সাকসেশন ও সম্পদ গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যাংকার সমাজে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে পড়েন। অর্থাৎ, প্রারম্ভিক জীবনের মনোকামনা পূরণ না হলে পরিবেশ ও প্রতিকূল অবস্থা নিরসনে ব্যাংকিংকে এক বিকল্প পেশা হিসেবে বিবেচনা করা হয়—যা দুঃখজনক ও অন্যায়। পরবর্তীতে তা এক সাময়িক বাহারি পোশাক, আলোকিত এসি-সজ্জিত অফিস আর কফির কাপের মতো একটি সীমিত চর্চার চিন্তায় ও পেশায় আটকে যায়।

ব্যাংকারের জীবন আর অভিলাষ থেকে যায় অপূর্ণ।

পেশাগত জীবনে ব্যাংকারের আকার ও প্রকার সাধারণত একরকম থাকে। পোশাক, পরিচয়পত্র, ল্যাপটপ বহনের ব্যাগ ও মোবাইল ফোনের ব্যবহারও যেন একই ধরনের। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে শিক্ষা সনদ, মানসিক গঠন ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, দেশ গড়ার চিন্তা ও অর্থনীতির কাঠামো থেকে বহু ব্যাংকারকে দূরে সরিয়ে রাখে।

প্রশিক্ষণের অভাব, সীমিত সুযোগ, বংশপরিচয় ও অযোগ্যতা অগ্রাধিকার পায়। গ্রাম থেকে আশা নিয়ে আসা এক যুবক ব্যাংকার কৃষিঋণের বিপক্ষে বৃহৎ ঋণ দিতে বাধ্য হয়ে পড়ে।

প্রশিক্ষণের অভাব গ্রাহক সেবার পরিবর্তে গ্রাহকভীতিতে পরিণত হয়, আর “কেন্দ্রীয় ব্যাংক”-ভীতিতে নিজেকে ও গ্রাহককে বেষ্টন করে তোলে।

বাংলাদেশ আজ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা ও সংস্কার নিয়ে কাজ করছে। কখনো কি ব্যাংকারদের চাকরির নিশ্চয়তা, সুরক্ষা, আইনের সমর্থন ও সামগ্রিক উন্নয়নের কথা চিন্তা করা হয়েছে? হয়তো না। বিপরীতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শাসন, পরিচালকদের অন্যায় অনুরোধ (ব্যতিক্রম বাদে), অন্যান্য সরকারি সংস্থার চাপ ও সামগ্রিক দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার—বারবার ব্যাংকারের জীবন ও তার পরিবারের জন্য এক বিশেষ হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

কার্যত, এই ধরনের ঘটনা ব্যাংকারদের নতুন কিছু ভাবতে বা করতে বাধা সৃষ্টি করেছে এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনকে প্রতিনিয়ত ব্যাহত করছে।

অবাক করার বিষয়, এ রকম শঙ্কার জীবন আর কোনো পেশায় আছে কি না, আমার জানা নেই। অথচ প্রতিদিন একজন ব্যাংকার সমাজের সকল মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা যেন এক রুটিনে পরিণত হয়েছে। পরিবারের সদস্যরাও যেন ব্যাংকারের সেই কঠিন পার্থিব জীবনকে মেনে নিয়েছেন এবং সে অনুযায়ী চলছেন।

মাসিক বেতন, বোনাস ও বার্ষিক ছুটি—এই নিয়েই জীবন। অবসরের পর আর কোনো রোজগার বা পেনশনের সুযোগ নেই। অথচ চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরও মামলা থেকে অবসর নেওয়ার সুযোগ থাকে না।

বাংলাদেশের প্রতিটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং বিভাগ সামগ্রিকভাবে তদারকি করে।

বিভিন্ন পদের নিয়োগ, ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য অনুমোদন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও মন্ত্রণালয় কর্তৃক সম্পাদিত হয়। অথচ একদিকে ব্যাংকার অবসরের পর এক পরিত্যক্ত জীবন অতিবাহিত করেন, অন্যদিকে চাকরিকালীন সময়ে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী তিনি জনগণ ও সরকারের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন। একদিকে আইনের দায়বদ্ধতা, অন্যদিকে পরবর্তীতে আইনের সহায়তার অভাব—এই দুইয়ের মিশ্রণে এক অসম্ভব পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই ব্যাংকারের জীবন ও অপূর্ণ অভিলাষ চলমান থাকে।

আমি মনে করি, এই মহান পেশার প্রাথমিক দিক বিবেচনা করে মহাবিদ্যালয় বা কলেজ পর্যায় থেকেই ব্যাংকিং বিষয়ে কার্যক্রম গ্রহণ করা উচিত। পাঠ্যবইয়ে কার বক্তৃতা থাকবে, সে দিকে দৃষ্টি না দিয়ে সন্তানদের মানসিক প্রস্তুতি আজ বেশি প্রয়োজন—যা বর্তমানে অনুপস্থিত।

আগামী দিনে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করব—ব্যাংকারদের জন্য ইন্স্যুরেন্স অথবা অবসর-উত্তর আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। যেহেতু ব্যাংকিং পেশায় আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা রয়েছে, তাই দীর্ঘমেয়াদি মামলার ক্ষেত্রে আইনি লড়াই ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে হবে।

ব্যাংকারদের জন্য সার্বক্ষণিক মেডিক্যাল ও ডেন্টাল সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকারি অথবা বেসরকারি খাতের হাসপাতালে স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা প্রয়োজন।

ব্যাংকারদের অবসরের পর সরকারি সহায়তায় জমি বরাদ্দ ও স্বল্পসুদে গৃহনির্মাণ ঋণ প্রদান করতে হবে।

আমি আশা করি, আগামী অর্থবছরে সরকার ব্যাংকারদের জন্য নতুন একটি প্রকল্প গ্রহণ করবেন, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কারণ ব্যাংকাররা দেশের অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাদের মাধ্যমেই কৃষির উন্নয়ন, রপ্তানি ও আমদানি বাণিজ্যের প্রসার, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব।

অপরদিকে, আমি আশা করি দেশের প্রতিটি ব্যাংকার ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কাজ করবেন এবং জনগণের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখবেন।

আমাদের স্লোগান হোক—“দেশের উন্নয়নে অব্যাহত আমাদের এই পথচলা, সবার আগে বাংলাদেশ।”

 

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকার

Link copied!