AB Bank
  • ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২৬,

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad QR Code
BBS Cables
Janata Bank
  1. জাতীয়
  2. রাজনীতি
  3. সারাবাংলা
  4. আন্তর্জাতিক
  5. অর্থ-বাণিজ্য
  6. খেলাধুলা
  7. বিনোদন
  8. শিক্ষা
  9. তথ্য-প্রযুক্তি
  10. অপরাধ
  11. প্রবাস
  12. রাজধানী

জলবায়ু পরিবর্তন ও শীতকালীন স্বাস্থ্য


Ekushey Sangbad
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
১২:৪৯ পিএম, ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫

জলবায়ু পরিবর্তন ও শীতকালীন স্বাস্থ্য

বাংলাদেশের শীতকাল এখন আগের মতো সহজভাবে অনুমেয় নয়। একসময় শীত মানেই ভোরে হালকা কুয়াশা, দুপুরে কিছুটা রোদ এবং রাতে তীব্র ঠান্ডা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে, অনেক এলাকায় দুপুর ১২টা পেরিয়েও সূর্যের আলো দেখা যায় না। ঘন কুয়াশা, ভিজা পরিবেশ এবং কম তাপমাত্রা কেবল আবহাওয়ার খবর নয়; এটি মানুষের স্বাস্থ্য, দৈনন্দিন জীবন এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।

আর এই পরিবর্তনের মূল কারণ হলো জলবায়ু পরিবর্তন। তাপমাত্রার ওঠানামা, আর্দ্রতার বৃদ্ধি এবং বায়ুমণ্ডলে দূষণ—সব মিলিয়ে শীতের স্বাভাবিক চিত্রকে বদলে দিয়েছে। এর ফলে শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থদের শরীর নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।

কুয়াশা ও দিনের আলো কমে যাওয়ার ঝুঁকি

সূর্যের আলো থেকে যে ভিটামিন ডি আমরা পাই, তা হাড়ের স্বাস্থ্য, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং মানসিক সুস্থতার জন্য অপরিহার্য। দিনের আলো কম থাকলে ভিটামিন ডি-এর অভাব দেখা দেয়, যা শিশু, গর্ভবতী মহিলা ও বৃদ্ধদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। শিশুদের মধ্যে ঘন কুয়াশা ও কম রোদ সর্দি, কাশি এবং নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। বয়স্কদের মধ্যে হাঁপানি, রক্তচাপের ওঠানামা এবং জোড়াব্যথা বেড়ে যায়। শহর ও গ্রামের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা সীমিত থাকায় ঝুঁকি আরও প্রকট।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বায়ুমণ্ডলে ধূলিকণা, গ্যাস নির্গমন এবং আর্দ্রতার অনিয়মিত বৃদ্ধি ঘন কুয়াশার প্রধান কারণ। এটি শিশু ও বয়স্কদের শ্বাসনালীতে দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া, কুয়াশা ও ধোঁয়াশা দূরদৃষ্টি কমিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ায়।

দিনের তাপমাত্রা হ্রাস ও জীবনযাত্রা

দিনে রোদ না থাকলে শরীরের স্বাভাবিক উষ্ণতা কমে যায়। কৃষক, নির্মাণ শ্রমিক, মাছ চাষি এবং দিনমজুরদের মতো শ্রমজীবী মানুষের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ। ঘন কুয়াশা ও কম তাপমাত্রায় কাজের গতি ধীর হয়, যা দৈনন্দিন আয় ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে।
শিক্ষার্থীরাও প্রভাবিত হয়। স্কুলে যাওয়ার পথে কুয়াশা ও কম আলো ঝুঁকির সৃষ্টি করে। সঠিক শীতবস্ত্র ছাড়া বাইরে গেলে শিশুদের শ্বাসনালী সংক্রমণ, সর্দি-কাশি এবং নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
শিল্পকর্ম ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও প্রভাব পড়ে। কম দিনের আলো ও তাপমাত্রায় কর্মদক্ষতা হ্রাস পায়। ফলে ব্যবসায়িক আয়ের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়তে পারে।

রাতের ঠান্ডা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

দিনে রোদ না থাকায় রাতের ঠান্ডা আরও তীব্র হয়। বয়স্ক ও অসুস্থদের জন্য এটি বড় ঝুঁকি।

* রক্তচাপের ওঠানামা * হাঁপানি ও হঠাৎ শ্বাসকষ্ট * আর্থ্রাইটিসের সমস্যা।

শিশুদের রাতের ঘুম প্রভাবিত হয়, যা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। গ্রামীণ এলাকায় কাঁচা বা অপ্রতিষ্ঠিত ঘর এবং খোলা আগুনের ব্যবহার শ্বাসনালী সংক্রমণ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। শহরের মানুষ হিটার বা বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করলে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থাকে।
জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ডা.এম এম মাজেদ বলেন, “শীতকালীন স্বাস্থ্যঝুঁকি এখন শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি পরিবার এবং সমাজের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ।

মানসিক স্বাস্থ্য ও কুয়াশার প্রভাব

ঘন কুয়াশা ও কম আলো মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
* ক্লান্তি ও উদাসীনতা * মন খারাপ এবং মনোযোগের ঘাটতি * সামাজিক কার্যক্রমে কম মনোযোগ।

দীর্ঘদিন কম আলো ও কুয়াশার মধ্যে থাকা ডিপ্রেশন, উদ্বেগ এবং স্ট্রেস বাড়াতে পারে। হালকা ব্যায়াম, ঘরে হাঁটা, যোগব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত আলো মানসিক সুস্থতার জন্য সহায়ক।

শিশু, বয়স্ক ও শ্রমজীবীর বিশেষ যত্ন
শিশুদের জন্য:

* সঠিক শীতবস্ত্র এবং উষ্ণ ঘর নিশ্চিত করা

* স্কুলে যাওয়ার পথে নিরাপত্তা ও শ্বাসনালী সংক্রমণ এড়িয়ে চলা

* উষ্ণ খাবার ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা

বয়স্কদের জন্য:

* রক্তচাপ, হাঁপানি ও আর্থ্রাইটিসের ওপর নজর রাখা

* রাতে ঘুমের ব্যাঘাত রোধে উষ্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা

* নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ

শ্রমজীবী মানুষের জন্য:

* কাজের সময় পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও উষ্ণ পানীয়

* দিনের আলো ও তাপমাত্রা অনুযায়ী কাজের সময় সামঞ্জস্য রাখা

* মাঠে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য হালকা ব্যায়াম ও গরম স্যুপ গুরুত্বপূর্ণ

স্বাস্থ্য সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক পরামর্শ

গরম কাপড় পরিধান: দিনে ও রাতে পর্যাপ্ত কাপড়, মোজা ও হ্যান্ডগ্লাভস

উষ্ণ পানীয় ও সুষম খাদ্য: গরম স্যুপ, দুধ, চা ও ফলমূল

পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম: রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি

পরিষ্কার ও উষ্ণ পরিবেশ: ঘর উষ্ণ ও ধূলিমুক্ত রাখা

শিশু ও বৃদ্ধদের নজরদারি: অসুস্থতা বা শ্বাসনালী সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা

সর্বোচ্চ সময় বাইরে না থাকা: ঘন কুয়াশা বা ঠান্ডার দিনে দীর্ঘ সময় বাইরে থাকা এড়িয়ে চলা

হালকা ব্যায়াম ও হাঁটা: শরীরের রক্ত সঞ্চালন ঠিক রাখতে সহায়তা করে

মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন: পর্যাপ্ত আলো, ব্যায়াম, যোগব্যায়াম ও ঘরে হাঁটা

সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব

শীতকালীন স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ অপরিহার্য।

* শীতবস্ত্র বিতরণ ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি

* শিশু ও বৃদ্ধদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা

* রোগী কল্যাণ কেন্দ্র ও স্বাস্থ্য সুবিধা প্রসার

* সরকারি ও অ-সরকারি সংস্থা একসাথে কাজ করলে প্রভাব আরও বৃদ্ধি পাবে

পরিশেষে বলতে চাই,কুয়াশা, রোদহীন দিন এবং তীব্র রাত কেবল আবহাওয়ার বিষয় নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তৈরি স্বাস্থ্যঝুঁকি। শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থদের সচেতনতা, প্রস্তুতি ও সতর্কতা অপরিহার্য।শীতকাল এখন শুধু রাতের অতিথি নয়; এটি দিনের প্রতিটি কাজে ও জীবনধারায় উপস্থিত। স্বাস্থ্য রক্ষায় সচেতনতা, সামাজিক সহায়তা এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ একসাথে থাকা জরুরি।
শীতের স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমাতে সকলের সচেতনতা, পরিবারিক যত্ন ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ অপরিহার্য। শিশু, বয়স্ক এবং শ্রমজীবীদের জন্য সচেতনতা, প্রস্তুতি ও সতর্কতা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।অতিরিক্ত সতর্কতা, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও সম্প্রদায়ভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে শীতকালীন স্বাস্থ্যঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

লেখক, কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

Link copied!