পানি পান করতে হবে। শুনতে সহজ এবং বিশ্বাসযোগ্য লাগলেও বাস্তবে বিষয়টি ঠিক এতটা সরল নয়। এই অভ্যাস কিছুটা উপকার করতে পারে, তবে আমরা যেভাবে ফল আশা করি, ঠিক সেভাবে নয়।
অনেকের মনে তাই প্রশ্ন জাগে-অতিরিক্ত পানি পান করে কি আমরা বাড়াবাড়ি করে ফেলছি? এতে কি সত্যিই ত্বক পরিষ্কার হয়, নাকি শুধু শরীর থেকে বের হওয়া প্রস্রাবই বেশি পরিষ্কার হয়?
আপনি ত্বক পরিষ্কারের জন্য ৮ গ্লাস পান পান করেন, আর একমাত্র যা পরিষ্কার হয় তা হলো আপনার প্রস্রাব- এমনটাই মন্তব্য এক বিশেষজ্ঞের। তিনি সহজভাবে এই বিষয়টিই তুলে ধরেছেন যে, আপনার শরীর ইতোমধ্যেই জানে কীভাবে পানিকে সামলাতে হয়। এবং যখন শরীরে পর্যাপ্ত পানি জমা হয়ে যায়, তখন এটি অতিরিক্ত পানি আপনার ত্বকে পাঠায় না, বরং তা শরীর থেকে বের করে দেয়।
তিনি ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে আপনার কিডনি একটি শক্তিশালী পরিস্রাবণ ব্যবস্থার মতো কাজ করে। কিডনি প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে তরল প্রক্রিয়াজাত করে, কিন্তু তার বেশিরভাগই আপনার শরীরে পুনরায় ফিরে আসে। শুধুমাত্র অল্প পরিমাণ পানিই প্রস্রাব হিসেবে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। সুতরাং, যখন আপনি আপনার শরীরের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বেশি পানি পান করতে থাকেন, তখন আপনার শরীর বলে, “আমাদের আর প্রয়োজন নেই,” এবং বাকিটা বের করে দেয়। একারণেই খুব স্বচ্ছ প্রস্রাব আসলে বোঝাতে পারে যে আপনি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পানি পান করছেন।
বার্লিনের শারিটে ইউনিভার্সিটির ২০১৮ সালের একটি পর্যালোচনার উদ্ধৃতি দিয়ে বিশেষজ্ঞ উল্লেখ করেছেন যে, যদি আপনি ইতিমধ্যেই পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করেন, তবে অতিরিক্ত পানি পান করলে আপনার ত্বকের উন্নতি হয়, এমন কোনো অকাট্য প্রমাণ নেই। তিনি কোরিয়ার ২০২৪ সালের একটি গবেষণার কথাও উল্লেখ করেন, যেখানে অতিরিক্ত পানি পানকারী একদল এবং ময়েশ্চারাইজার ব্যবহারকারী অন্য একদল মানুষের মধ্যে তুলনা করা হয়েছিল। আশ্চর্যজনকভাবে, ময়েশ্চারাইজারটি বেশি কার্যকর ছিল।
আপনি কতটা পানি পান করছেন তার চেয়ে আপনি কী খাচ্ছেন তা অনেক বড় ভূমিকা পালন করে। আমেরিকান জার্নাল অফ ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনের গবেষণা থেকে দেখা যায়, “অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার আপনার ব্রণের ঝুঁকি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। স্কিম মিল্কও ব্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত, কারণ এটি এমন একটি হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় যা আপনার তেল গ্রন্থিগুলোকে আরও বেশি তৈলাক্ত পদার্থ নিঃসরণ করতে নির্দেশ দেয়, যা লোমকূপ বন্ধ করে দেয়।”
তাই শুধু পানির ওপর মনোযোগ না দিয়ে, আপনার ত্বক স্বাস্থ্যকর চর্বি (যেমন স্যামন মাছ), ভিটামিন এ ও সি, জিঙ্ক-সমৃদ্ধ খাবার এবং প্রতিদিনের সানস্ক্রিনে আরও ভালোভাবে সাড়া দেয়। শরীরের পানিশূন্যতা থাকলে হাইড্রেশন সাহায্য করে। অনেকে মনে করেন, অতিরিক্ত পানি জাদুকরীভাবে ত্বকের সমস্যা সমাধান করে না।
অপর একজন বিশেষজ্ঞের মতে, “বিষয়টি আসলে ‘হয় এটা নয়তো ওটা’র মতো নয়, বরং দুটোই প্রয়োজন।” তিনি ব্যাখ্যা করেন যে হাইড্রেশন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমরা বিষয়টি নিয়ে খুব সংকীর্ণভাবে চিন্তা করে আসছি। বিষয়টি শুধু আপনি কতটা পানি পান করছেন তা নয়, বরং আপনার শরীর সেই পানি কতটা ভালোভাবে ব্যবহার করছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, “যদি আপনার পুষ্টির অভাব থাকে কিন্তু আপনি লিটার লিটার পানি পান করেন, অথবা ভালো খাবার খান কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী পানিশূন্যতায় ভোগেন, তবে কোনো পদ্ধতিই সর্বোত্তম ফল দেবে না।” পর্যাপ্ত পানিপান, পুষ্টি, সুরক্ষা এবং সাধারণ জীবনযাপনের সমন্বয়ে ত্বক পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যকর হয়। বেশিরভাগ মানুষ একটি বিষয়ের ওপর অতিরিক্ত মনোযোগ দিয়ে অন্য বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করার ভুলটি করে থাকে।
তাই, দিনে ৮ গ্লাস পানি পানের পেছনে না ছুটে, পর্যাপ্ত পানিপান ও পুষ্টির মধ্যে ভারসাম্য রেখে এই সমস্যার সমাধান করুন।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

