রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহের মধ্যে ভয়াবহ দাবানলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ফ্রান্স। দীর্ঘস্থায়ী খরা, অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রা ও প্রবল বাতাসের কারণে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে আগুন। ঘন কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে বিস্তীর্ণ আকাশ, আর আগুন নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছেন দমকলকর্মীরা।
দক্ষিণ ফ্রান্সের আউদ, পিরেনে-ওরিয়ঁতাল, বুশ-দ্যু-রোনসহ কয়েকটি এলাকায় একাধিক বড় দাবানল এখনো সক্রিয় রয়েছে। শুধু আউদ অঞ্চলে প্রায় ৯০০ হেক্টরের বেশি বনভূমি পুড়ে গেছে। কোথাও কোথাও ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটার বেগে বাতাস বইতে থাকায় আগুন দ্রুত নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।
ফরাসি সরকার জানিয়েছে, চলতি গ্রীষ্ম মৌসুমে এখন পর্যন্ত ৭ হাজারের বেশি দাবানলের ঘটনা ঘটেছে। এতে ৮ হাজার ৭০০ হেক্টরেরও বেশি বনভূমি পুড়ে গেছে। সাধারণত জুলাইয়ের শেষ দিকে দাবানলের প্রকোপ বাড়লেও এবার মৌসুম শুরুর আগেই তা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বসন্তে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হওয়ায় বনাঞ্চল অত্যন্ত শুষ্ক হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে তীব্র গরম ও দমকা বাতাস যুক্ত হওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
দাবানল নিয়ন্ত্রণে প্রায় দুই হাজার দমকলকর্মী কাজ করছেন। তাদের সহায়তায় মোতায়েন করা হয়েছে কানাডেয়ার অগ্নিনির্বাপক বিমান, হেলিকপ্টার ও বিশেষায়িত উড়োজাহাজ। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে হাজারো মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি আবাসিক এলাকা, শিল্পাঞ্চল, গুদামঘর ও পর্যটন ক্যাম্পসাইট আগুনের হুমকির মুখে রয়েছে। পরিস্থিতির কারণে কিছু এলাকায় সড়ক ও বিমান চলাচলেও সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
এদিকে তাপপ্রবাহের কারণে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপও বেড়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, শ্বাসকষ্ট ও হৃদরোগজনিত সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন বয়স্করা। বিশেষ করে ৮৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সময়ে বাড়িতে মৃত্যুর হার আগের সপ্তাহের তুলনায় প্রায় ৯১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুন-জুলাইয়ে ফ্রান্সের অনেক অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে। রাতের তাপমাত্রাও ২০ ডিগ্রির নিচে নামছে না, ফলে সৃষ্টি হয়েছে ‘ট্রপিক্যাল নাইট’ পরিস্থিতি, যা মানুষের শরীরে দীর্ঘস্থায়ী তাপচাপ সৃষ্টি করছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপে তাপপ্রবাহ এখন আরও ঘন ঘন, দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র হয়ে উঠছে। এর ফলে দাবানলের ঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনি কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপরও গভীর প্রভাব পড়ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি বৈঠক করে বনাঞ্চলে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে ফরাসি সরকার। নাগরিকদের অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং দাবানলপ্রবণ এলাকায় আগুন ব্যবহার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। আবহাওয়া বিভাগ সতর্ক করেছে, আগামী কয়েক দিনও উচ্চ তাপমাত্রা অব্যাহত থাকতে পারে, ফলে দাবানলের ঝুঁকিও বহাল থাকবে।
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

