অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েছে। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, ইতালি, স্পেন, জার্মানি, বেলজিয়াম ও সুইজারল্যান্ডসহ মহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি বা তারও বেশি পৌঁছেছে।
সবচেয়ে সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে ফ্রান্সে। দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকায় তীব্র গরমের প্রভাব পড়েছে। প্রচণ্ড তাপদাহ থেকে স্বস্তি পেতে নদী, খাল ও বিভিন্ন জলাশয়ে নামতে গিয়ে গত কয়েক দিনে অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৮ জুনের পর থেকে নজরদারিবিহীন জলাশয়ে সাঁতার কাটার সময় এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে। কর্তৃপক্ষ জনগণকে নিরাপদ স্থানে সাঁতার কাটার পরামর্শ দিয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যেতে নিরুৎসাহিত করছে।
তাপপ্রবাহের কারণে ফ্রান্সের শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান ব্যাহত হয়েছে। ইতোমধ্যে ৮৪৫টি স্কুল সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, আর অনেক প্রতিষ্ঠানে সকালবেলায় সীমিত সময়ের জন্য ক্লাস পরিচালিত হচ্ছে।

দেশটির আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, মধ্যাঞ্চলের পইটিয়ার্স এলাকায় তাপমাত্রা ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলের কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এদিকে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি এলাকায় অতিরিক্ত গরমে গাড়ির ভেতরে আটকে থাকা দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনাও আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
নাগরিকদের গরম থেকে কিছুটা স্বস্তি দিতে প্যারিস কর্তৃপক্ষ ২৫ বছরের কম বয়সী ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তিদের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সিনেমা হলে বিনামূল্যে প্রবেশের ব্যবস্থা করেছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় ইউরোপ দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণ হয়ে উঠছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, ‘ওমেগা ব্লক’ নামে পরিচিত একটি আবহাওয়াগত পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘস্থায়ী তাপবলয় সৃষ্টি হয়েছে, যা তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

পরিবহন ও অর্থনীতিতেও প্রভাব
তাপপ্রবাহের কারণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। রেললাইনের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ফ্রান্স ও প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে ট্রেনের গতি কমানো হয়েছে। ফলে কিছু আন্তর্জাতিক ট্রেন চলাচলও বাতিল করা হয়েছে।
অতিরিক্ত গরমে বৈদ্যুতিক পাখার চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় প্যারিসের অনেক দোকানে ফ্যানের সংকট দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতে, তাপপ্রবাহের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিও কমে এসেছে।

অন্যান্য দেশেও সতর্কতা
জার্মানিতে কয়েক দিন ধরে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে রয়েছে এবং শিগগিরই তা ৪০ ডিগ্রি ছুঁতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দেশটিতে তাপপ্রবাহজনিত কারণে কয়েকজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
ইতালির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১৫টি শহরে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। কিছু খাতে কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং অতিরিক্ত বিদ্যুতের চাহিদা সামাল দিতে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

স্পেনে বিভিন্ন অঞ্চলে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। আবহাওয়া বিভাগ সতর্ক করে জানিয়েছে, কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
বেলজিয়ামে অতিরিক্ত গরমের কারণে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষা ভবনের বাইরে অপেক্ষাকৃত শীতল স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একইভাবে যুক্তরাজ্যেও তাপপ্রবাহের কারণে কিছু স্কুলে পাঠসূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করেছেন, আগামী কয়েক দিন ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে, ফলে জনস্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর ওপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

