উত্তর আফ্রিকার সংঘাতপীড়িত দেশ সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর একটি ঘাঁটিতে ড্রোন হামলায় ছয়জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও অন্তত আটজন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে।
ঘটনাটিকে অত্যন্ত নৃশংস ও উদ্বেগজনক উল্লেখ করে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেছেন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের লক্ষ্য করে এমন হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন এবং এটি যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে। একই সঙ্গে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানান তিনি।
আল-জাজিরার বরাতে জানা গেছে, শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) সুদানের মধ্যাঞ্চলীয় দক্ষিণ কোরদোফান রাজ্যের কাদুগলি শহরে অবস্থিত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর একটি লজিস্টিক ঘাঁটিতে এই ড্রোন হামলা চালানো হয়। নিহত ও আহত সবাই বাংলাদেশি এবং তারা জাতিসংঘের ইউনাইটেড নেশনস ইন্টারিম সিকিউরিটি ফোর্স ফর আবিয়েই (ইউএনআইএসএফএ) মিশনে কর্মরত ছিলেন।
রোববার (১৪ ডিসেম্বর) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, শান্তিরক্ষীদের ওপর এ ধরনের হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে, এই ঘটনার জন্য দায়ীরা বিচারের মুখোমুখি হবে।
সুদানের সেনাবাহিনী হামলার জন্য আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-কে দায়ী করেছে। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, এ হামলা বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের ধ্বংসাত্মক মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ। তবে হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আরএসএফের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুদানি সেনাবাহিনী একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে হামলার পর জাতিসংঘের ওই স্থাপনা থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা যায় বলে দাবি করা হয়েছে।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসও এ ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, নিহত ও আহত বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের পরিবারের পাশে সরকার থাকবে। পাশাপাশি তিনি জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানান, যেন আহতদের জন্য সব ধরনের জরুরি চিকিৎসা ও সহায়তা নিশ্চিত করা হয়।
উল্লেখ্য, তেলসমৃদ্ধ আবিয়েই অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরে সুদান ও দক্ষিণ সুদানের মধ্যে বিরোধপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। দক্ষিণ সুদান ২০১১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে সেখানে নিরাপত্তা রক্ষায় জাতিসংঘের ইউএনআইএসএফএ মিশন মোতায়েন রয়েছে।
মহাসচিব গুতেরেস সুদানে অবিলম্বে সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশটিতে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও রাজনৈতিক সমাধানমূলক প্রক্রিয়া শুরু করা জরুরি।
২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে সুদানের সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়। এর পর থেকে দেশটি ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, এ সংঘাতে এখন পর্যন্ত ৪০ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, যদিও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ধারণা প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।
এই সংঘাতে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। গণহত্যা, ধর্ষণ ও জাতিগত সহিংসতাসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে, যেগুলোকে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। এর ফলে সুদানে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে এবং অনেক অঞ্চল দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে পড়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই হামলার মাত্র এক মাস আগেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ইউএনআইএসএফএ মিশনের মেয়াদ আরও এক বছরের জন্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অন্যতম বৃহৎ সেনা ও পুলিশ সদস্য প্রেরণকারী দেশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে আবিয়েই অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।
বর্তমানে ইউএনআইএসএফএ মিশনে প্রায় চার হাজার শান্তিরক্ষী মোতায়েন রয়েছেন, যাদের মূল দায়িত্ব হলো সংঘাতপ্রবণ ওই অঞ্চলের বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

