ঢাকা শুক্রবার, ১২ আগস্ট, ২০২২, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৯

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad
Janata Bank
Rupalibank

প্রস্তাবিত বাজেটে নিন্মবিত্তদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাবে না


Ekushey Sangbad
নিজস্ব প্রতিবেদক
০৭:৩৪ পিএম, ১১ জুন, ২০২২
প্রস্তাবিত বাজেটে নিন্মবিত্তদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাবে না
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সভাপতি অধ্যাপক হারুনুর রশিদ খান ও সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আতিকুর রহমান আজ এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ২০২২-২৩ অর্থ বছরের জন্য মহান জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী প্রস্তাবিত বাজেট প্রত্যাখান করে বলেছেন, অর্থমন্ত্রী আ.হ.ম মোস্তফা কামাল জাতীয় সংসদে ৬ লক্ষ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার ঋণ নির্ভর ঘাটতি বাজেট পেশ করেছেন। 

ইতিমধ্যেই অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা এ বাজেটকে অবাস্তব বাজেট বলেছেন। কারণ  বড় বাজেট পেশ করা হলেও এই বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। বাজেটটি মূলত অবাস্তব, উচ্চাবিলাসি ও ঋণনির্ভর। বলা যায়, অতীতের ন্যায় গতানুগতিক বাজেট। প্রস্তাবিত বাজেট ও প্রবৃদ্ধির হার বাস্তবতা বিবর্জিত ও কল্পনা নির্ভর। বাজেটে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে। চলতি বছর বাজেটের অনেকাংশেই সরকার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। বাজেটে প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ৭.৫ শতাংশ, আর বাজেট ঘাটতি হচ্ছে জিডিপির ৫.৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ধরা হয়েছে ৫.৬ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেট ও প্রবৃদ্ধির হার বাস্তবতা বিবর্জিত ও কল্পনা নির্ভর। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট এডিপি ধরা হয়েছে ২ লক্ষ ৪ হাজার ৬৬ কোটি টাকা, রাজস্ব খাতে আয় ধরা হয়েছে (বৈদেশিক অনুদানসহ) ৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের শেষ তিন মাসে আয় করতে হবে ১ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। যা আদায় করা প্রায় অসম্ভব। দেশের ব্যাংকিং খাত সংকটে রয়েছে। বাজেটে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা ঋণ  নেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে ব্যাংকিং খাতকে আরো সঙ্কট আরো প্রকট হবে। এভাবে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই অবাস্তব ও সমস্যা সৃষ্টি করে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।

নেতৃবৃন্দ বলেন, এবারও বাজেটে কৃষিখাতে অগ্রাধিকারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সেখানে বরাদ্দ অপ্রতুল। উৎপাদনের উপকরণের মূল্য হ্রাস, রাসায়নিক সারের মূল্য কমানো, কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতসহ কৃষিখাতকে যথাযথ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়নি। প্রকৃত উদ্যোক্তাদের দিকেও বাজেটে বিশেষ মনোযোগ নেই। শিল্প খাত অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির শিল্পে প্রায় তিন কোটি মানুষ সম্পৃক্ত। একে একে রাষ্ট্রায়াত্ব শিল্পগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বাজেটে রাষ্টায়ত্ব শিল্পখাতসহ শিল্পখাতকে পুরোপুরি অবহেলিত রাখা হয়েছে। প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি। করোনা ও রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে অনেকেই অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন। রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত এসকল মানুষের পুনর্বাসনের জন্য বাজেটে কোনো দিক নির্দেশনা নেই।  

বহুল আলোচিত কালো টাকা, অনুপার্জিত অর্থ ও পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার ও বাজেয়াপ্ত করার জন্য শক্ত ও কার্যকরি পদক্ষেপ আশা করেছিলো জনগণ। কিন্তু উল্টো পদক্ষেপের পরিবর্তে অনৈতিকভাবে এসব টাকা ফেরত আনার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যা রাষ্ট্রীয়ভাবে দুর্নীতি, লুটপাট ও দুর্বৃত্তায়নকে উৎসাহ যোগানো হয়েছে। মূলত স্বজনপ্রীতি ও স্বজন তোষণের জন্য এই বাজেট পেশ করা হয়েছে। বাজেটে বিশেষ কিছু মানুষকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। বরাবরের মতই যে সকল হতদরিদ্র, দিন আনে দিন খায় ও অনানুষ্ঠানিক খাতে যারা কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে  সে সকল শ্রমিকরা বরাবরই উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী বাজেট থেকে কোন প্রকার লাভবান হচ্ছে না।

প্রস্তাবিত বাজেটের মেগা প্রকল্পসমূহের ধার মেটাতে ৮০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। দরিদ্র জনগণকে উপোস রেখে উন্নয়নের নামে এই সকল প্রকল্পে দুর্নীতির উৎসব চলছে। অথচ বেশ কিছু মেগা প্রকল্পই এখন অপ্রয়োজনীয় বলে প্রমাণিত হয়েছে। দুর্নীতি আর লুটপাটে দেশের স্বাস্থ্যখাত বিপর্যস্ত। দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে মূলত দরিদ্র জনগোষ্ঠীরাই চিকিৎসা সেবা নিয়ে থাকে। সেই স্বাস্থ্যখাতেও সবচেয়ে কম বরাদ্ধ  দেওয়া হয়েছে।

যৌথ বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল, চিনিকল, বস্ত্রকলগুলো ধারাবাহিকভাবে বন্ধ করে দিয়ে অসংখ্য শ্রমিককে কর্মহীন করে রাখছে। এই সকল শ্রমিকদের শতশত কোটি টাকা বছরের পর বছর বকেয়া রয়ে গেছে। যা এই বাজেটেও পরিশোধের কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে যেকোন সময় শ্রমিকরা ধৈর্য্যহারা হয়ে আবারও বকেয়া আদায়ের জন্য রাজপথে নেমে আসতে পারে। দেশের অর্থনীতির সমৃদ্ধ করার জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরীর বিকল্প নেই। কিন্তু দক্ষ জনশক্তি তৈরী করার জন্য সরকার কোন বরাদ্ধ রাখেনি।

দেশের এক শ্রেণীর মানুষের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে অসহায় দরিদ্র মানুষদের দিনের পর দিন ঠকিয়ে আসা হচ্ছে। ইতোমধ্যে দেশের দুই তৃতীয়াংশ সম্পদ এক শ্রেণীর মানুষের কুক্ষিগত হয়ে গিয়েছে। এই শ্রেণীর কাছে আজ দেশ ও জনগণ জিম্মি হয়ে পড়েছে। অর্থমন্ত্রী এই শ্রেণীধারা ভাঙতে কোন উদ্যোগ নেননি। ফলে দেশের অধিকাংশ জনগোষ্ঠী ক্রমান্বয়ে গরিব থেকে আরও গরীব হচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশের তিন কোটির অধিক মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে চলে গেছে। এইভাবে একটি দেশের অর্থনীতি চলতে পারে না। এ মুহূর্তে দেশের নিন্ম আয়ের মানুষকে বাঁচাতে তাদের জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করতে হবে। কর্মহীন মানুষের জন্য কর্মসংস্থান করার পাশাপাশি কর্মহীনদের জন্য প্রণোদনা দিয়ে কর্মের সৃষ্টি করার জন্য বিশেষ বরাদ্ধ রাখতে হবে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নে শ্রমিকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য হলেও শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার জন্য বাজেটে  কোনো বরাদ্দের কথা বলা হয়নি। দ্রব্যমূল্যের ভয়াবহ ঊর্ধ্বগতিতে বিপর্যস্ত বেশিরভাগ মানুষ। কিন্তু তাদের জন্য  কোন স্বস্তির কোনো খবর নেই। উল্টো বিশাল ঋণ নির্ভর ঘাটতি বাজেটের দায় শেষ পর্যন্ত অসহায় জনগণকে  মেটাতে হবে। বাজেটে শ্রমজীবী মানুষের জন্যও স্বস্তির খবর নেই। বাজেটে ধনী-গরিবের বৈষম্য বহাল রাখা হয়েছে। ফলে এ বাজেটে আগের মতই ধনীরা আরো ধনী হবে আর গরিবরা আরো গরিব হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে হতদরিদ্র ও নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাবে না। দেশের এক তৃতীয়াংশ মানুষ ক্ষুদ্র শিল্পের সাথে জড়িত। এই সকল মানুষের জন্য বাজেটে নতুন কিছু রাখা হয়নি। অথচ করোনার এই মহামারী ও পরবর্তি সার্বিক একটি শ্রমিক বান্ধব বাজেট প্রত্যাশিত ছিলো। দারিদ্র্য দূরীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার কথা মুখে মুখে বলা হলেও তা বাস্তবায়নের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা বা রূপরেখা তুলে ধরা হয়নি।

নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, বর্তমান সরকার দেশ পরিচালনায় করতে গিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজম্মের ওপর ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার প্রস্তাবিত এ বাজেটে ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬৪ কোটি টাকার বিশাল অংকের ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি মেটাতে দেশ-বিদেশ থেকে চড়া সূদে ঋণ নিতে হবে সরকারকে। বিশেষ করে  দেশীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা সরকার ঋণ হিসেবে নিয়ে নিলে  বেসরকারি ও ব্যক্তিগত খাতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। বিদেশ থেকে ঋণ নেওয়া হবে ৯৮ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা। বাজেট ব্যয়ের বিশাল অংশ খরচ হবে ঋণের সুদ পরিশোধে। যা কোনভাবেই একটি সরকারের দায়িত্বশীলতার পরিচয় বহন করেনা। আর বর্তমান সরকার জনগণের সরকার নয়। তাই জনগণের স্বার্থ বাদ দিয়ে এক শ্রেণীর মানুষের তাবেদারী করে যাচ্ছে। জনগণের কাছে জবাবদিহির অনুভূতি না থাকায় ক্ষমতাশীনরা নিজেদের পকেট ভারীর করার কাজে বেশী মত্ত। আমরা বাংলাদেশের মেহনতি শ্রমিক সমাজের পক্ষ থেকে ২০২২-২৩ অর্থ বছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট প্রত্যাখান করলাম।

নেতৃবৃন্দ সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, অবিলম্বে এই বাজেট জাতীয় সংসদ থেকে প্রত্যাহার করুন। পুনরায় দেশের মানুষ কথা চিন্তা, শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থের কথা চিন্তা করে শ্রমিক বান্ধব বাজেট পেশ করুন। দেশের শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন না হলে কোন উন্নয়ন দেশের কাজে আসবে না। দল-মত নির্বিশেষে বিজ্ঞ অর্থনীতিবিদদের নিয়ে নতুন বাজেট প্রণয়ন করুন। অন্যথায় শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও জীবন জীবিকা রক্ষার জন্য আমরা শ্রমজীবী মানুষদের সাথে নিয়ে আগামী দিনে রাজপথে নেমে আসতে বাধ্য হবো।

 

একুশে সংবাদ/এস.আই