AB Bank
  • ঢাকা
  • সোমবার, ০৮ জুন, ২০২৬,

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad QR Code
BBS Cables
Janata Bank
  1. জাতীয়
  2. রাজনীতি
  3. সারাবাংলা
  4. আন্তর্জাতিক
  5. অর্থ-বাণিজ্য
  6. খেলাধুলা
  7. বিনোদন
  8. শিক্ষা
  9. তথ্য-প্রযুক্তি
  10. অপরাধ
  11. প্রবাস
  12. রাজধানী

সিন্ডিকেটের কবলে মৌলভীবাজারের চামড়া বাজার



সিন্ডিকেটের কবলে মৌলভীবাজারের চামড়া বাজার

• পথে বসার শঙ্কায় ব্যবসায়ীরা
• ফ্রি’তেও নিচ্ছে না ছাগল-ভেড়ার চামড়া
• লবণ ও শ্রমিক সংকটে দিশেহারা ব্যবসায়ীরা

সারা দেশে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হওয়ার পর পশুর চামড়া বেচাকেনা হলেও মৌলভীবাজারে সরকার নির্ধারিত দামের কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।

দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা মূল্যের বড় গরুর চামড়াও বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২০০ টাকায়। ছাগলের চামড়া ফ্রি-তেও কেউ নিচ্ছে না। ফলে বিক্রি করতে না পেরে অনেকে চামড়া মাটি চাপা দিয়েছেন। কেউ কেউ আবার নদনদীতে ভাসিয়ে দিয়েছেন।

এছাড়া অন্যান্য বছরের মতো এ বছর এতিমখানা কিংবা কওমি মাদরাসা শিক্ষার্থীরাও চামড়া সংগ্রহে বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন না। পাইকারি ক্রেতাদের অনাগ্রহের কারণে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা নামমাত্র মূল্যে চামড়া কিনছেন।

এদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনেও পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। কেনা দামের চেয়ে অনেক কম দাম বলছেন আড়তদাররা। তারা না পারছেন চামড়া বিক্রি করতে, না পারছেন যথাযথভাবে সংগ্রহ করতে।

এতিমখানা ও কওমি মাদরাসা কর্তৃপক্ষ সুত্রে জানা গেছে, একসময় কোরবানির ঈদ মানেই ছিল এতিমখানা, মাদরাসা আর গরিব মানুষের জন্য বাড়তি আয়ের বড় উৎস।

সেই পশুর চামড়াই এখন অনেকের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মৌলভীবাজারের সাত উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এবার দেখা গেছে ভয়াবহ চিত্র। ছাগল-ভেড়ার চামড়া রাস্তার পাশে পড়ে আছে, ফ্রি দিলেও নিতে চাচ্ছে না কেউ।

আর লাখ টাকার গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১০০-২০০ টাকায়। এছাড়া জেলার জুড়ী নদী, ধলই মনু নদীতে কোরবানির পশুর চামড়া ভাসিয়ে দেওয়ার চিত্রও দেখা গেছে। আবার পথের ধারে ধারেও চামড়া ফেলে দেয়ার চিত্রও চোখে পড়েছে।

মৌলভীবাজার জেলার প্রধান চামড়ার হাট বালিকান্দিসহ প্রায় সব জায়গায় একই চিত্র দেখা গেছে। জেলার সদর উপজেলার আমতৈল গ্রামের নওয়াব আলী বলেন, দুইটা চামড়া তিন শ টাকায় কিনেছিলাম আর ১০টি চামড়া কোরবানিদাতাদের কাছ থেকে বিনামূল্যেে সংগ্রহ করেছিলাম।

শহরের পৌর বাস টার্মিনালে বিক্রি করতে এসেছিলাম। কোনো ক্রেতা এক টাকাও দাম দিতে রাজি নন। আসা-যাওয়ার রিকশা ভাড়া পকেট থেকে দিতে হলো এবং একদিনের রোজ গেল।

শহরের পৌর বাস টার্মিনাল এবং শ্রীমঙ্গল শহরের চৌমুহনা, স্টেশন রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় ঈদের দিন দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দেখা গেছে অনেক কোরবানিদাতা চামড়া নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন, কিন্তু ন্যায্যমূল্যের তো প্রশ্নই আসে না উল্টো কোথাও ক্রেতাই পাওয়া যায়নি। তবে সীমিত পরিসরে চামড়া কেনাবেচা চললেও বাজারে ছিল হতাশার ছাপ।
গরুর চামড়া আকার ও মানভেদে ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর খাসির চামড়া কোনো কোনো এলাকায় ৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অনেক জায়গায় বিনামূল্যেও কেউ নিতে রাজি হয়নি।

দুই লাখ টাকার গরুর চামড়া দুইশ টাকা কেমনে হয়? এটা তো গরিব আর এতিমের হক। গরিবের হক ধনীরা মেরে খাচ্ছ। দুই লাখ টাকা দিয়ে গরু কিনে কোরবানির পর চামড়া বিক্রির সময় এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন মৌলভীবাজার শহরের বাসিন্দা লুৎফুর রহমান। সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি হলেও দুঃখ ছিল না। অথচ এই টাকাগুলো এতিম-মাদরাসার কাজে লাগার কথা। প্রতি বছরই হক থেকে বঞ্চিত হচ্ছে গরিব-এতিমরা।

রাজনগর উপজেলার মশাজান গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আমরা ২ লাখ ৮ হাজার টাকা দামের গরুর চামড়া মাত্র ২০০ টাকায় বিক্রি করেছি। তিনি বলেন রাজনগরে পথে পথে চামড়া ফেলে গেছেন কোরবানি দাতারা।

কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সিবাজার এলাকার ফেরদাউস জামান জানান, তার ২ লাখ ২৩ হাজার টাকার গরুর চামড়া বিক্রি করতে হয়েছে মাত্র ২০০ টাকায়। অনেকে ধলই নদীতেও চামড়া ভাসিয়ে দিচ্ছেন বলেন তিনি জানান।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বালিকান্দি গ্রামের হাটে প্রায় দুই শ বছর ধরে চামড়া বেচাকেনা হয়।  এক সময়ের চামড়া ব্যবসায়ী ওই গ্রামের বাসিন্দা সৈয়দ মুজাহিদ আলী জানান, এই গ্রামের মানুষ বংশ পরম্পরায় কাঁচা চামড়ার ব্যবসা করে আসছেন। গত ১০-১২ বছর ধরে চামড়ার বাজারে ধস নেমেছে। ফলে অনেকে বাপ-দাদার ব্যবসা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। তাদের কারো লাখ, কারো কোটি টাকা ট্যানারি মালিকরা আটকে রেখে পথে বসিয়েছেন।

সত্তরোর্ধ চামড়া ব্যবসায়ী সুলেমান মিয়া জানান, এখন পর্যন্ত ৫ শর বেশি চামড়া কেনা হয়েছে। ১০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত দাম পড়েছে। শেষ পর্যন্ত কটা কিনতে পারবেন আগেই বলা যাবে না। তিনি জানান, লবণের অভাবে ক্রয় করা সব চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হবে না। ফলে নষ্ট চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়তে হবে।

চামড়া থেকে মাংস আলাদা করা শ্রমিক মাহমুদ আলী জানান, যেসব চামড়া কেনা-বেচা হচ্ছে সবই এক-দেড় শ টাকায়। চামড়া ব্যবসায়ীরা গল্প মারেন ৬-৭ শ টাকায় চামড়া কিনেছেন। তিনি বলেন, কিছু এতিমখানার হুজুর চামড়া নিয়ে অমুক-তমুকের কাছে ধর্ণা দিলেও কেউ কিনতে রাজি হচ্ছে না।

শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বিপাকে পড়েছেন দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ীরাও। বালিকান্দিবাজার চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শওকত আলী বলেন, ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের কাছে গত বছরের ৯৫ লাখ টাকা এখনও বকেয়া। এ বছর দুই হাজারের মতো চামড়া কিনে লবণ লাগানো হয়েছে। তিনি জানান, প্রয়োজন তিন-চার শ মণ লবণ। মজুত আছে মাত্র দেড় শ মণ। লবণের অভাবে দুর্গন্ধ ধরা চামড়া ও বর্জ্য মাটি চাপা দিতে হবে। অথবা মনু নদে ভাসিয়ে দিতে হবে, এছাড়া উপায় নেই।

প্রায় ৪০ বছর ধরে চামড়া ব্যবসায় জড়িত মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলের বাসিন্দা লায়েক মিয়া। ভুক্তভোগী ওই ব্যবসায়ী বলেন, আমি প্রতি বছরই তিন হাজারের অধিক গরু-ছাগলের চামড়া কিনি। এ বছর শুধু গরুর চামড়া কিনেছি, ছাগল কিনিনি। গড়ে ১০০ সর্বোচ্চ দুইশ টাকা দিয়ে দেড় হাজার গরুর চামড়া কিনেছি।

একটি চামড়ার পেছনে তিনশ টাকার বেশি খরচ হয়েছে। ট্যানারি মালিকের কাছে পূর্বের লাখ লাখ বকেয়া থাকায় এবং উপযুক্ত দামে এবার চামড়া বিক্রি করতে না পারলে আমি পথে বসার উপক্রম হবে। সরকারের পক্ষ থেকে লবনসহ কোনো ধরণের সহযোগিতা পাচ্ছি না।

তিনি আরো বলেন, জেলা প্রশাসক একবার মিটিং করে বলেছিলেন মাদরাসা-এতিমখানায় লবন বিতরণ শেষে অতিরিক্ত থাকলে আমাদের মাঝে বিতরণের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু এখনো সে আশ্বাস বাস্তবায়ন হয়নি। হয়তো অতিরিক্ত লবন না থাকায় দিতে পারছেন না তিনি।

এছাড়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদের নিয়ে কোনো মিটিং বা সহযোগিতা করা হয়নি। চামড়া সংগ্রহ করতে শ্রমিক সংকট ও লবনের দাম বৃদ্ধি, ট্যানারি মালিকের কাছে বছরের পর বছর ধরে বকেয়া, উপযুক্ত মামে চামড়া বিক্রি করতে না পারাসহ নানা কারণে আমরা পথে বসার উপক্রম হচ্ছে।

চামড়া ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী জানান, আগে সারা বছর বালিকান্দির অন্তত ২৫-৩০ জন চামড়া কেনাবেচা করতেন। এখন শওকত মেম্বার, সুলেমান মিয়া, আনেয়ার মিয়া, জামাল মিয়া ও সানুর মিয়া নিয়মিত এই ব্যবসা করেন।  আরও ২০-২৫ জন মৌসুমী ব্যবসায়ী রয়েছেন।

মৌলভীবাজারের চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে বকেয়া টাকার পাহাড় জমে যাওয়ায় মাঠপর্যায়ে ভেঙে পড়েছে পুরো সংগ্রহ ব্যবস্থা।

জেলা চামড়া ব্যবসায়ী মালিক সমিতির তথ্যমতে, বর্তমানে মৌলভীবাজার ব্যবসায়ীদের কোটি টাকা বিভিন্ন ট্যানারি প্রতিষ্ঠানের কাছে আটকা আছে। ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, কয়েক বছর আগেও কোরবানিতে ভালো মানের গরুর চামড়া ২ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হতো। খাসির চামড়ার দাম ছিল ২০০ থেকে ৪০০ টাকা। কিন্তু ২০১৮ সালের পর থেকে বাজারে ধস নামতে শুরু করে। বর্তমানে গরুর চামড়া ২০০ থেকে ৫০০ আর খাসির চামড়া ৫ থেকে ৩০ টাকায় নেমেছে।

বিশেষ করে খাসির চামড়া নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। কারণ গরুর চামড়া কিছুদিন লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা গেলেও খাসির চামড়া দ্রুত নষ্ট হয়।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এবারো ঢাকার প্রভাবশালী ট্যানারি সিন্ডিকেট কাঁচা চামড়ার বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। সরকার দাম নির্ধারণ করলেও মাঠপর্যায়ে তার কোনো বাস্তবায়ন নেই। এদিকে দেশের মোট কাঁচা চামড়ার বড় অংশ আসে কোরবানির ঈদকেন্দ্রিক সময়ে। অথচ সেই মৌসুমেই সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়ে বাজার। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এতিমখানা, কওমি মাদরাসা, মৌসুমি ফড়িয়া ও গ্রামীণ দরিদ্র মানুষ।

তাদের দাবি, শুধু বাজার ধস নয়, ঢাকার ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেট, লাখ লাখ টাকার বকেয়া এবং নগদ অর্থ সংকট মিলেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে দেশের ঐতিহ্যবাহী চামড়া শিল্পকে।

জেলা প্রশাসন জানায়, চামড়া দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এ সম্পদ রক্ষা ও সংরক্ষণে প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। চামড়া ব্যবসায়ীরা যাতে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেজন্য প্রশাসনের সর্বোচ্চ নজরদারি রয়েছে।

 

একুশে সংবাদ/ওজি

সর্বোচ্চ পঠিত - সারাবাংলা

Link copied!