মানুষের শেষ বিদায়ের পর চিরনিদ্রার জন্য মাটির নিচে কবর তৈরি করাই তার জীবনের কাজ। কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই পরকালের চিন্তা ও মানুষের দোয়ার প্রত্যাশায় টানা ৫০ বছর ধরে কবর খুঁড়ে চলেছেন চাঁদপুরের বিল্লাল হোসেন খান।
বর্তমানে ৬৬ বছর বয়সী এই ব্যক্তি এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে ৩০৮টি কবর খনন করেছেন।
চাঁদপুর পৌরসভার ১৩নং ওয়ার্ডের বাহের খলিশাডুলী এলাকার ইদ্রিস খানের ছেলে বিল্লাল হোসেনের জন্ম ১৯৬০ সালের ৯ নভেম্বর। বর্তমানে ২ ছেলে ও ১ মেয়ের জনক তিনি। এক সময় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও বর্তমানে সেখান থেকে তিনি অবসর নিয়েছেন।
বিল্লাল হোসেন জানান, জীবনের শুরুর দিকে তিনি কিছুটা অন্যপথে চলতেন। ‘বান-টোনা’ বা তুকতাক বিদ্যার সাথে জড়িত ছিলেন তিনি। কিন্তু একদিন হাজীগঞ্জ বড় মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে গিয়ে এক অলৌকিক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন।
সিজদাহ দিতে গিয়ে তিনি বাধার মুখে পড়েন। পরে মসজিদের তৎকালীন ইমামের পরামর্শে তিনি আলোর পথ খুঁজে পান। ইমাম তাকে উপদেশ দিয়েছিলেন—বিনামূল্যে মানুষের কবর খনন করার জন্য। সেই ১৬ বছর বয়স থেকেই শুরু হয় তার এই নিঃস্বার্থ পথচলা।
বিল্লাল হোসেন তার প্রতিটি কাজের হিসাব রাখতেন একটি ডায়েরিতে। তবে দুর্ভাগ্যের বিষয়, একটি অগ্নিকাণ্ডে সেই প্রিয় ডায়েরিটি পুড়ে গেছে। ডায়েরি পুড়লেও তার মনে গেঁথে আছে সংখ্যাটি-৩০৮।
দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় এখন আর কবর খুঁড়তে কোনো ফিতা বা মাপের প্রয়োজন হয় না তার। চোখের আন্দাজেই তিনি নিখুঁতভাবে তৈরি করতে পারেন মানুষের শেষ ঠিকানা। এই কাজ করতে গিয়ে অনেক অলৌকিক ঘটনার সাক্ষীও হয়েছেন এই বৃদ্ধ।
ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী বিয়োগের পর এবং বয়সের ভারে বর্তমানে তিনি আগের মতো শারীরিক পরিশ্রম করতে পারেন না। তবুও কোনো মৃত ব্যক্তির সংবাদ পেলেই আজও ছুটে যান। আর্থিক অনটনের মাঝেও নামাজ-কালাম আর মানুষের সেবাতেই সময় কাটছে তার। তবে এই দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতি পাওয়ার এক সুপ্ত বাসনা তার মনে রয়ে গেছে।
বিল্লাল হোসেন বলেন, "মানুষ যখন আমাকে প্রাণভরে দোয়া করে, সেটাই আমার পথ চলার শক্তি। অভাব থাকলেও মনে এক ধরণের আত্মতৃপ্তি পাই। যদি সরকারের পক্ষ থেকে বা কোনোভাবে আমার এই কাজের স্বীকৃতি পেতাম, তবে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মরেও শান্তি পেতাম।"
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

