মৌলভীবাজারের চা শিল্পাঞ্চলে ২৯টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। এর মধ্যে খাসিয়া, গারো, মণিপুরী, ত্রিপুরা, খাড়িয়া, জীখাসিয়া, সবর, রিকিয়াসন, বারাইক, কন্দ, রাজবল্লভ, ভূঁইয়া, সাঁওতাল, ওরাও, গড়াইত, মুন্ডা, কুর্মী, ভুমিজ, বুনারাজি, লোহার, গঞ্জু, পাঙাল ও কড়া জনগোষ্ঠী উল্লেখযোগ্য। এসব জনগোষ্ঠীর মানুষ নিজস্ব ভাষায় কথা বলে, লেখে ও পড়ে।
বাংলাদেশের অতি বিপন্ন ভাষাগুলোর মধ্যে আদিবাসী গোষ্ঠী খাড়িয়াদের ভাষা অন্যতম। চা-বাগান শ্রমিক এই জনগোষ্ঠীর মাত্র দু’জন সদস্যের হাত ধরে এখনো টিকে আছে খাড়িয়া ভাষা। তারা হলেন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার বর্মাছড়া চা-বাগানের শ্রমিক ভেরোনিকা কেরকেটা (৮১) ও তাঁর বোন খ্রিস্টিনা কেরকেটা (৭৬)। এখনই সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে তাঁদের মৃত্যুর সঙ্গে চিরতরে হারিয়ে যাবে এই ভাষা।
বাংলাদেশে ৪৩টি আদিবাসী গোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষার অস্তিত্ব রয়েছে। বৈজ্ঞানিক ভাষা সমীক্ষায় বম, কোল, চাক, শো, খাসি, কোড়া, পাংখুয়া, খাড়িয়া, সৌরা, কোডা, মুন্ডারি, মালতো, কন্দ, খুমি, রেংমিতচা, খিয়াং, লালেং (পাত্র) ও লুসাই ভাষাকে বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব ভাষা ব্যবহারকারীর সংখ্যা খুবই কম।
একসময় বাংলাদেশের চা শিল্পাঞ্চলে কর্মরত অসংখ্য খাড়িয়া শ্রমিকের ভাষা ছিল খাড়িয়া। কালের বিবর্তনে ভাষাটি প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। এখন সেটি কেবল ভেরোনিকা ও খ্রিস্টিনার মুখে টিকে আছে।
বীর তেলেঙ্গা খাড়িয়া ল্যাঙ্গুয়েজ সেন্টারের অন্যতম উদ্যোক্তা পিওস নানোয়ার জানান, নব্বইয়ের দশকে স্কুলশিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় তিনি তাঁর দাদির কাছ থেকে প্রথম কিছু খাড়িয়া শব্দ শিখেছিলেন। ঐতিহ্যবাহী ভাষাটি টিকিয়ে রাখতে ২০১৭ সালে বর্মাছড়া বাগানের উত্তরণ যুব সংঘের মাধ্যমে ‘বীর তেলেঙ্গা খাড়িয়া ল্যাঙ্গুয়েজ সেন্টার’ নামে একটি ভাষা শিক্ষাকেন্দ্র গঠন করা হয়। প্রাথমিকভাবে ভেরোনিকা ও খ্রিস্টিনার মাধ্যমে কিছু শিশুকে খাড়িয়া ভাষা শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা টেকসই করা যায়নি।
২০২৪ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী, দেশে ৯৮ দশমিক ২৭ শতাংশ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, হাজং, মুরংসহ কয়েকটি গোষ্ঠীর মানুষ নিজস্ব ভাষায় কথা বলে থাকেন।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলা এবং হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার চা-বাগানগুলোর ৪১টি শ্রমিক কলোনিতে খাড়িয়া জাতিগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। সরকারিভাবে ২০১৯ সালে তৈরি আদিবাসী গোষ্ঠীর তালিকায় খাড়িয়াদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০২০ সালে সংগঠনের পক্ষ থেকে এসব শ্রমিকপাড়া ঘুরে খাড়িয়া জনগোষ্ঠীর প্রায় এক হাজার মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়। তবে অনুসন্ধানে ভেরোনিকা ও খ্রিস্টিনা ছাড়া খাড়িয়া ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারেন—এমন কাউকে পাওয়া যায়নি।
শ্রীমঙ্গলের রাজঘাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান বিজয় বুনার্জি বলেন, দেশের চা-বাগানগুলোতে বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠীর মানুষের বসবাস। তাদের অনেক ভাষা সংরক্ষণ ও চর্চার অভাবে বিপন্ন হয়ে পড়েছে। খাড়িয়া তার মধ্যে একটি। এটি সংরক্ষণে যথাযথ কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। বর্তমানে অনেকেই সাদ্রি, বাংলা ও দেশোয়ালির সংমিশ্রণে একধরনের কথ্য ভাষায় কথা বলেন। প্রকৃত খাড়িয়া ভাষা দুই বোনের মৃত্যুর পর হারিয়ে যেতে পারে।
ভেরোনিকা কেরকেটা জানান, পাঁচ বছর আগেও তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা খাড়িয়া ভাষায় কথা বলতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর এখন পরিপূর্ণভাবে খাড়িয়া ভাষা জানেন—এমন দু’জন সদস্য হিসেবে তিনি ও তাঁর বোনই জীবিত রয়েছেন। তাঁদের মৃত্যুর পর আর কেউ এই ভাষাটি জানবেন না বলে তিনি আশঙ্কা করেন।
খ্রিস্টিনা কেরকেটা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, তাঁদের দু’জনের মৃত্যুর পর আর খাড়িয়া ভাষায় কথা বলার কেউ থাকবে না। সরকার যেন দ্রুত এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়—এ দাবি জানান তিনি।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসলাম উদ্দিন বলেন, এ অঞ্চলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে খাড়িয়া ভাষা সংরক্ষণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
এ ছাড়া স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরতে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উদ্যোগে এবং উপজেলা প্রশাসন শ্রীমঙ্গলের আয়োজনে ‘হারমোনি ফেস্টিভ্যাল ২০২৫’ আয়োজন করা হয়। সেখানে প্রায় ২১টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরার সুযোগ পায়।
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

